বিমানবন্দর থেকে শাহজাদপুরে গেলেন ১৩ ঘণ্টায়, খরচ ৮০০ টাকা 

সাদী আব্দুল্লাহ্

নজরুল ইসলামের ধারণা ছিল, অন্তত মহাসড়কে গেলে বাড়ি যাওয়ার কোনো না কোনো গাড়ি পাবেন। তিনি এই উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছেন বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত। কিন্তু এখান থেকেও দূরপাল্লার কোনো গাড়ি নেই। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা শেষে স্থানীয় একজনের পরামর্শে আরও ৬০ টাকা রিকশা ভাড়া খরচ করে গেলেন রাজধানীর আবদুল্লাহপুর মোড়ে। এরপর সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন গাড়ির জন্য।

সকাল তখন ১০টা। আবদুল্লাহপুরের মোড়ে তখন হাজারো মানুষের জটলা। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কোলে শিশু, আবার কারও মাথায় বস্তা। সবাই অপেক্ষা করছেন যানবাহনের জন্য। কিন্তু তেমন কোনো যানবাহন নেই। মাঝেমধ্যে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন সবাই। তাঁদের মধ্যে নজরুল ইসলামও একজন।

ভাড়ায় না বনায় ও অটোরিকশায় উঠতে না পেরে অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন নজরুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি যাবেন, নাকি আবার বাসায় ফিরবেন—এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেকটা চিন্তায় পড়ে যান তিনি। কিন্তু বাসায় গেলে বাসা থেকে বের হতে পারবেন না বা ভোগান্তি আরও বাড়বে, এই ভেবে সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়িই যাবেন। এরপর আবদুল্লাহপুর থেকে একটি অটোরিকশায় করে আরও ২০০ টাকা খরচ করে যান গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত।

গাজীপুর চৌরাস্তাতে একই অবস্থা। অনেক যাত্রী। কোনো যানবাহন নেই। এর মধ্যে কোনো একটা অটোরিকশা আসতে দেখলেই ছুটছেন লোকজন, এখানেও যাত্রীদের হুড়োহুড়ি। এরপর এখানেও প্রায় ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে অটোরিকশায় ১৫০ টাকা ভাড়ায় যান গাজীপুরের চান্দুরা এলাকা পর্যন্ত। এরপর সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী গাড়ির জন্য।

চান্দুরে যেতে যেতে ঘড়িতে সময় প্রায় বেলা আড়াইটা। তখন বেশ বৃষ্টি। নজরুল ইসলাম আরও কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে অপেক্ষা করছেন পাশের একটি চায়ের দোকানে। কিন্তু এটা মহাসড়ক, সিরাজগঞ্জ যেতে এখান থেকে আর কোনো অটোরিকশা বা অন্য কোনো ধীরগতির যান চলবে না, তাই নজরুল পড়েছেন বেকায়দায়। এরপর অনেকটা হতাশ হয়ে সময় পার করতে থাকেন চায়ের দোকানে।

বিকেল চারটার দিকে নজরুল ইসলামের মতো আরও অনেক যাত্রীই জড়ো হয়েছেন সেখানে। তাঁদের কেউ বগুড়া, কেউ রাজশাহী, কেউবা যাবেন দিনাজপুর। গাড়ি না থাকায় তাঁদেরও হাল একই। উপায় না পেয়ে তাঁরা সবাই মিলে সড়কে থাকা একটি ট্রাক দাঁড় করান। এরপর সবাই মিলে ট্রাকটি ভাড়া করে রওনা দেন যাঁর যাঁর বাড়ির উদ্দেশে। এর মধ্যে নজরুল সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ভাড়া দেন ৩০০ টাকা।

রাত ৯টার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নজরুল ইসলাম জানান, তিনি একটু আগে বাড়ি ফিরেছেন। এই সময় পুরো যাত্রার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ বাড়ি আইতে খুব কষ্ট হইছে, খুব ঝুঁকি নিয়া আইছি। ৩০০ ট্যাহার ভাড়া ৮০০ ট্যাহা দিয়া আইছি। জীবনে এরম কষ্ট আর করি নাই।’

এত ঝুঁকির মধ্যেও বাড়ি গেলেন কেন, জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার চাকরিটা খুব ছোট। বেতনও কম। তাই অল্প ভাড়ায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে একটি মেসে থাকি। বিধিনিষেধের পর অন্যরা সবাই বাড়ি চলে গেছেন। মেস বন্ধ। একা থাকতে গেলে না খাইয়া থাকতে হইব। বাধ্য হইয়াই বাড়ি চইলা আইছি।

Loading...