আছে নানা অর্জন, প্রশ্ন আমলানির্ভরতা নিয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। গতবারের মতো এবারও করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ফলে ঘরের বাইরের কর্মসূচি কমানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের লক্ষ্যই হলো দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের “সোনার বাংলাদেশ” এবং বাঙালিদের বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দলের মধ্যে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও গণতন্ত্রের চর্চা অটুট থাকলে কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’
৭২ বছরের ইতিহাসে দলটি এই প্রথম পরপর তিন দফা সরকারে আছে। রাষ্ট্রক্ষমতার টানা এক যুগে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা অর্জন যেমন রয়েছে, আবার সমালোচনাও রয়েছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগ অনেকাংশে আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। জনগণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
স্বাধীনতার পর প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তিন বছর দেশ শাসন করে আওয়ামী লীগ। এরপর ২১ বছর বিরোধী দলে থেকে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে দলটি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার সরকারে আসে দলটি। এরপর ২০০৯ সাল থেকে টানা ১২ বছর—সব মিলিয়ে দুই দশক দেশ শাসনের ভার পেয়েছে আওয়ামী লীগ।
বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে লেখেন, ‘আর মুসলিম লীগের পেছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের…নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোনো কর্মপন্থাও নাই।’
বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ৭২ বছরেও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভুল-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগই গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দল।
বঙ্গবন্ধুর সেই আওয়ামী লীগও কি আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে—এই প্রশ্ন দলের ভেতরেই আলোচিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নেওয়া ‘মুজিব বর্ষের’ অনুষ্ঠান এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালায় আমলাদের প্রাধান্য নিয়ে অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ঘনিষ্ঠজনদের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেছেন। করোনা সংক্রমণ ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ে ৬৪ জেলায় একজন করে সচিবকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও দলীয় নেতারা আমলানির্ভরতা হিসেবেই দেখছেন। এমনকি বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেওয়া নিয়েও আলোচনা আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ সমালোচিত হচ্ছে নির্বাচনব্যবস্থা অকার্যকর করার অভিযোগে। মানুষের ‘ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার’ জন্য ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ। পরে ওই বছরের জুন মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে পারেনি দলটি। ২০০৯ সালে পরিবর্তনের ডাক এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে আবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ একতরফা জয় পায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও সবার জন্য সমান মাঠ নিশ্চিত না হওয়া এবং প্রশাসনের সহায়তায় বিজয় নিশ্চিত করার অভিযোগ ওঠে। মূলত ২০১৪ সালের একতরফা জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও বিরোধীদের মাঠছাড়া করা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়া, ভোটের দিন জবরদস্তি, জাল ভোট প্রদান—এসব অনেকটা রীতি হয়ে দাঁড়ায়।

বিরোধী দল হিসেবে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগের গত এক যুগের শাসনকালে দেশে কার্যকর বিরোধী দলশূন্য হওয়ার কথাও উঠছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির একাধারে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হওয়া এবং সরকারের অংশীদার করার ঘটনা বাংলাদেশে আর ঘটেনি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত পুরো মেয়াদেই জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহায়তায় দ্বৈত ভূমিকা পালন করে গেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভা থেকে জাতীয় পার্টির নেতারা বাদ পড়লেও সরকারের সঙ্গে সখ্য কমেনি। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ গত বছরের ১৫ নভেম্বর সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ১১ বছর ধরে ২৪ ঘণ্টা দেশ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘উনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ছাড়া বিকল্প কাউকে দেখি না।’

এই সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিপুল অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে দেশ। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। এই সাফল্যের মাঝেও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ভেতরেই এমন আলোচনা আছে যে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে সরকার ও দল একাকার হয়ে গেছে। ফলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড দিবসভিত্তিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দলের নেতাদের একটা অংশ সাংসদ, জনপ্রতিনিধি হতে দৌড়ঝাঁপে লিপ্ত। এ জন্য জাতীয় সংসদের একটি আসনের উপনির্বাচনে ৩০-৪০ জন নেতা প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। দলের ভেতর কোন্দলও প্রকট হয়েছে।

তবে বঙ্গবন্ধুর সহচর ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ একেটিভিকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ৭২ বছরেও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভুল-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগই গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দল। এই দলই মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। প্রতিষ্ঠার শুরুতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হকের মতো প্রথিতযশা নেতারা।
মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে পরে আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে দলটি আরও বিকশিত হয়। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশের মানুষকে সংগঠিত করে আওয়ামী লীগ। এভাবে ২৪ বছরের সংগ্রাম পরিণতি পায় ১৯৭১ সালে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের লাল-সবুজের পতাকা ও বাংলাদেশের মানচিত্র অর্জিত হয়। দেশের স্বাধীনতা এনে দেওয়া দলটির ইতিহাস তাই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য নূহ উল আলম লেনিন একেটিভিকে বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের গঠনের মাধ্যমে প্রথমবার গণতন্ত্রের উপাদান যুক্ত হয়। এরপর স্বাধীনতা পর্যন্ত যা কিছু অর্জন, এর সবকিছুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ জড়িয়ে ছিল। ৭২ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হারানোর মতো ত্যাগও স্বীকার করতে হয়েছে। আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা আছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ এর ঊর্ধ্বে নয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ অন্য সীমাবদ্ধতা ম্লান করে দিয়েছে।’

কর্মসূচি
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে রয়েছে সূর্যোদয়ের ক্ষণে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল নয়টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। তবে এতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত অংশগ্রহণের কথা বলেছে দলটি।
বিকেল চারটায় দলের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতি হিসেবে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হবেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে।

Loading...