টিকটকের ফাঁদে ফেলে তরুণীদের ভারতে পাচার

‘টিকটকের ফাঁদে ফেলে তরুণীদের ভারতে পাচার’—গত ২৯ মে সংবাদের শিরোনাম। যে ঘটনা ধরে সংবাদ, তা ভয়ংকর। এক তরুণীকে মধ্যপ্রাচ্যে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। সেখানে কয়েকজন মিলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনা অনুসন্ধান করে বের হয়ে আসে মগবাজারের রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় টিকটকের ভিডিও তৈরির প্রলোভন দেখিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণীকে ভারতে পাচার করছেন। পরে হৃদয়সহ এই চক্রের আরও কয়েকজন গ্রেপ্তার হন। তরুণীকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়।
এই একটা ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা আরও ঘটছে। তবে বেশির ভাগ রয়ে যায় অন্তরালে। মামলা হলে কিংবা ‘ভাইরাল’ হলে তবেই সেগুলো সম্পর্কে জানা যায়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ জানালেন, ‘গত ১৫-২০ দিনেই পাঁচটি মামলা হয়েছে। এ শুধু তেজগাঁও বিভাগের হিসাব। এই পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৩ জন।’ ছোট এই পরিসংখ্যানে বোঝা যায় টিকটকের মতো অ্যাপে ওত পেতে আছে অপরাধীরা, যাদের শিকার হতে হচ্ছে কিশোরী-তরুণীদের।
বিশেষত, তরুণদের কাছে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় টিকটক অ্যাপ। ছোট ছোট করে নানা রকম ভিডিও প্রচার করা যায় এই অ্যাপে। লাইকি নামে এমন আরেকটি অ্যাপও বাংলাদেশে জনপ্রিয়। তবে টিকটক এগিয়ে। টিকটকে অনেকেই আছেন, যাঁদের অনুসারী লাখ লাখ। আর লাইকের সংখ্যা মিলিয়নের বেশি। বেশির ভাগ টিকটকার কম বয়সী তরুণ-তরুণী। বেশির ভাগ ভিডিও জনপ্রিয় গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে অঙ্গভঙ্গি করার। টিকটক ও লাইকির মতো অ্যাপে যাদের ভক্ত, অনুসারীর সংখ্যা বেশি, ভিডিওতে লাইক বেশি, তাদের অর্থ আয়েরও সুযোগ। আর আছে বিপুল পরিমাণ তরুণ-তরুণীদের কাছে পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ, তা ইতিবাচকভাবেই হোক কিংবা নেতিবাচক।
‘স্টার’ বানিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নেওয়া, পাচার করে দেওয়া, ধর্ষণের ঘটনা, আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেল, এমনকি হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে মেয়েদের বেলায়। ‘শর্টকাট’ পথে তারকা হওয়ার ইচ্ছা বা তারকাজগতের হাতছানিতে মেয়েরা জড়িয়ে যাচ্ছে অপরাধীদের জালে। এসব বিষয় তো চলে আসছে অনেক আগে থেকেই।
সিনেমা বা টেলিভিশনে নায়িকা বানানোর কথা বলে কত মেয়ের সর্বনাশ করেছে অপরাধীরা, তার হিসাব নেই। নব্বইয়ের দশকে এই ঢাকাতেই দেখা গেছে মডেল তৈরির নানা কারখানা। তারপর এল মিউজিক ভিডিও আর প্যাকেজ নাটকে অভিনয় করিয়ে নায়িকা তৈরির প্রলোভন। আর এই হাল জমানায় চলছে ‘টিকটক স্টার’ তৈরির আশ্বাস। তারকা হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা যেহেতু মানুষের মধ্যে থাকে, তাই অপরাধীরা জনপ্রিয় মাধ্যমকে ব্যবহার করে সব সময়। মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মের বদল ঘটে, কিন্তু অপরাধ সেই আগের মতোই। নারীকে যেতে হয় ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
স্নাতক পরীক্ষা দিয়েছেন ঢাকার বাঁধন। টিকটক যখন মিউজিক.লি ছিল, তখন থেকেই তাঁর একটি আইডি আছে এতে। ৫ বছরে তাঁর অনুসারী ১০ হাজারের বেশি। ভিডিওগুলোতে লাইক দুই লাখের কাছাকাছি। ‘শখে প্রথমে নামিয়েছিলাম মিউজিক.লি। গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে ভিডিও করা যায়। ভালোই লাগত। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করি ভিডিও করা।’

অন্যান্য টিকটকারের চেয়ে বাঁধন ব্যতিক্রম। তিনি বললেন,‘আমার কয়েকজন বন্ধু আছে, যাদের এক বছরের মধ্যেই ফলোয়ার ৮০ হাজার-এক লাখ। আগে টিকটকের বেশির ভাগ ভিডিওতে শালীনতা ছিল, কিন্তু বেশি লাইকের জন্য এখন অনেকেই অদ্ভুত, অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে, স্ল্যাং ব্যবহার করে।’ ষষ্ঠ শ্রেণিপড়ুয়া থেকে বিভিন্ন বয়সীরা টিকটক ব্যবহার করে। কমবয়সী অনেকে ভুয়া আইডি খুলে অন্যের আইডিতে এসে গালিগালাজও করে।
কী ধরনের প্রলোভন দেখা যায় টিকটক বা লাইকিতে? বাঁধন জানালেন, ফলোয়ার বাড়ানোর কথা বলে কেউ। কারণ, তাহলে অর্থ আয় করা যায়। কেউ বলে সেলিব্রিটি করে দেবে। জীবন ঘুরে যাবে। ‘কেউ যদি আমাকে এসে বলে তোমার ফলোয়ার এক মিলিয়ন করে দেব বা দ্বিগুণ করে দেব, আমি তো তা বিশ্বাস করব না। কিন্তু পড়াশোনা কম করেছে, কিংবা পারিবারিকভাবে সচেতন নয়, এমন মেয়েরা এসব বিশ্বাস করে এবং পরে ভয়ংকর পরিণতি হয়।’ বললেন বাঁধন। আরও যোগ করলেন, এই সব মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে দেখা করার কথা বলে নিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। এ রকম ফাঁদ এড়াতে শিক্ষা আর সচেতন থাকার বিকল্প নেই। করোনার কারণে মাসের পর মাস স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এসব অপরাধ বেড়েছে।
পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করলেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপ্রধান অ্যাডভোকেট সালমা আলীও। তিনি বললেন, মোবাইলে ছবি তুলতে পারে, শুধু এইটুকু জ্ঞান নিয়ে মেয়েরা অনলাইনের নানা মাধ্যমে যাচ্ছে। মা-বাবাও এসব বোঝেন না। নির্দিষ্ট বয়সের আগে তো ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া উচিত নয়।
প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের ঘটনা অনেক ঘটছে। সব ভাইরাল হয় না। সালমা আলী তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, শিশু ও নারী পাচারে স্থানীয় এলাকাবাসী, সীমান্ত অঞ্চলের মানুষজন—বাংলাদেশে ও ভারতে দুই দেশেই অনেকে জড়িত থাকে। এদের ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতে ঢোকামাত্রই এদের নামে রেশন কার্ডসহ যাবতীয় কাগজপত্র তৈরি হয়ে যায়। পাচার ঠেকাতে দুই দেশের কাজ করতে হবে একসঙ্গে। বিদেশ ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরেও এমন ঘটনা ঘটছে। নতুন নতুন প্রযুক্তিকেন্দ্র করে যেসব অপরাধ হচ্ছে, সেগুলো ঠেকাতে পুলিশের দক্ষতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান আরও বাড়াতে হবে এবং অভিভাবকদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে বলে মনে করেন সালমা আলী।
অনলাইনের জনপ্রিয় কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই বাংলাদেশে নিবন্ধিত নয়। শুধু ভ্যাট নিবন্ধন করে পুরো সমস্যার সমাধান করা যাবে না বলে মনে করেন বাংলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘বেশ তো’র প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন,‘বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন না থাকলে প্রয়োজনের সময় আইনগতভাবে তেমন কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে। পাশাপাশি করোনাকালে মাসের পর মাস স্কুল-কলেজ বন্ধ। তরুণদের খেলাধুলা বা সুস্থ বিনোদনের জায়গাও নেই। ফলে প্রযুক্তির অপব্যবহার, তারকাখ্যাতির লোভ দেখিয়ে ফাঁদে পড়ার ঘটনা ঘটছে।
টিকটক, লাইকি বা এ ধরনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যবহারকারী থাকায় এসব মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধীরা। তাদের মূল টার্গেট নারী। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ বললেন, ‘টিকটক উঠতি বয়সীদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু এখন যেভাবে অপরাধ বাড়ছে, তাদের এ ধরনের মাধ্যমগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’

গান-নাচ-অভিনয়, খেলা কিংবা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া কিংবা তারকা হতে হলে মেধা, সৃজনশীলতা কিংবা পরিশ্রমের কোনোই বিকল্প নেই। নেই কোনো শার্টকাট। গুণ থাকলে গুণী হওয়া যাবেই, কেউ কাউকে জনপ্রিয় করে দিতে পারবে না। এমন কোনো প্রস্তাব কেউ দিলে সেটা আসলে প্রলোভন, ফাঁদ।

Loading...