পাচারকারীর কবল থেকে ফিরে নুরজাহান নিজেই পাচারে জড়ান

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা)

মালয়েশিয়ায় পাচার হয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন নুরজাহান ওরফে নদী আক্তার ওরফে জয়া আক্তার ওরফে জান্নাত ওরফে ইতি (২৮)। সেখান থেকে দেশে ফিরে নিজেই নারী পাচারকারী চক্রে জড়িয়ে পড়েন। হয়ে ওঠেন ভারতসহ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সমন্বয়ক।
ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি তরুণী নির্যাতনের ঘটনায় আলোচনায় আসা ‘টিকটক হৃদয় বাবু’র নারী পাচারকারী চক্রের সমন্বয়ক নূরজাহানসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে হাতিরঝিল থানার পুলিশ। গতকাল সোমবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যশোরের শার্শা থানার পাঁচভূলট, বেনাপোল থানার পুটখালী এবং নড়াইল শহরের ডহর রামসিদ্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে পাসপোর্ট, ভারতের আধার কার্ড (পরিচয়পত্র), মুঠোফোন, ভারতের সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আজ মঙ্গলবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পাচারকারীর কবল থেকে ফিরে নুরজাহান নিজেই পাচারে জড়ান
গ্রেপ্তার হওয়া নারী পাচারকারী চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন আল আমিন হোসেন (২৮), সাইফুল ইসলাম (২৮), আমিরুল ইসলাম (৩০), পলক মণ্ডল (২৬),তারিকুল ইসলাম (২৬) ও বিনাশ শিকদার (৩৩)।
তেজগাঁও বিভাগের পুলিশের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ তাঁর দপ্তরে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,ভারতে নারী পাচারকারী রিফাদুল ইসলাম হিসেবে পরিচিত টিকটক হৃদয় ওরফে বাবুর সঙ্গে গ্রেপ্তার নুরজাহানের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ধরা পড়ে। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত। নুরহাজান শুধু ভারতে নন,মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও নারী পাচারের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন।
গত মে মাসের শেষের দিকে ভারতে বাংলাদেশের এক তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। ওই ঘটনায় বেঙ্গালুরু পুলিশ টিকটক হৃদয়সহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে হাতিরঝিল থানা পুলিশ মগবাজারের বাসিন্দা ওই তরুণীর পরিচয় বের করার পাশাপাশি যৌন নির্যাতনে জড়িত টিকটক হৃদয়কে শনাক্ত করে ভারতীয় পুলিশকে জানায়।

নারী পাচারে জড়িত এক মহিলা ইউপি সদস্য
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তা শহিদুল্লাহ জানান, ওই ঘটনা উদ্‌ঘাটনের পর ভারতে পাচারের শিকার একাধিক নারী ভারত থেকে পালিয়ে এসে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। একের পর এক বেরিয়ে আসে নারী পাচারের ঘটনা। পাচারকারী চক্রের সমন্বয়ক হিসেবে উঠে আসে নুরজাহানের নাম। নারী পাচারে যশোরের শার্শার একজন মহিলা ইউপি সদস্য জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পাচারের সময় সীমান্তরক্ষীদের হাতে নারীরা ধরা পড়লে ছাড়িয়ে আনতেন ওই ইউপি সদস্য।

নুরজাহানের যত নাম
পাচারকারীর কবল থেকে ফিরে নুরজাহান নিজেই পাচারে জড়ান
পুলিশের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. হাফিজ আল ফারুক আজ একেটিভিকে বলেন,নুরজাহান দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়েদের ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দিতেন। এরপর চক্রের সদস্যরা ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করতেন। পাচারের শিকার নারীদের কাছে তিনি নদী হিসেবে পরিচিত। ভারতে অবস্থানরত পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাঁকে ইতি বলে ডাকেন। ভারতের আধার কার্ডে (পরিচয়পত্র) তাঁর নাম জয়া আক্তার জান্নাত। পাসপোর্টে তাঁর নাম নুরজাহান। সাতক্ষীরা সীমান্তে তাঁর নাম জলি, যশোর সীমান্তে তিনি প্রীতি হিসেবে পরিচিত। দুবাইয়ে তিনি লায়লা নামে পরিচিত।

আল আমিনের বাড়িতে রাখা হতো মেয়েদের
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার আল আমিন ২০১৭ সালে নারী পাচারে যুক্ত হন। গত বছর ঈদুল আজহার পর ভারতে নারী পাচারের সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা মেয়েদের তাঁর বাড়িতেই রাখা হতো।
গ্রেপ্তার সাইফুলের বাড়ি যশোরের শার্শায়। তাঁর পাঁচভূলট বাজারে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা আছে। নারী পাচারে যুক্ত ইসরাফিল হোসেন ওরফে খোকন, আবদুল হাই, সবুজ, আল আমিন ও ইউপি সদস্য তাঁর মাধ্যমে লেনদেন করতেন। সাইফুল পুলিশের উপস্থিতি টের পেলে পাচারকারী চক্রের সদস্যদের জানিয়ে দিতেন।
অনলাইনে ব্যাংকিংয়ে ব্যবহৃত তাঁর মুঠোফোনটি জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার পলক মণ্ডল আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। তাঁর কাছে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নিতে আসা গ্রামের গরিব মেয়েদের ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থানরত পাচারকারী চক্রের সদস্য তাসলিমা ওরফে বিউটির কাছে পাঠিয়ে দিতেন।

Loading...