ছোট ছোট পরিবর্তন ভোগাবে নতুন বাজেটে

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা প্রকাশ: ০২ জুন ২০২১

ছোট ছোট পরিবর্তন ভোগাবে
নতুন বাজেটে আয়কর খাতে কিছু ছোট পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন কর বসতে পারে, আবার নানা শর্ত আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে।

কর রেয়াতের বিনিয়োগসীমা কমতে পারে।
ধনীদের ওপর সারচার্জের হার বাড়তে পারে।
ফল ও সবজি আমদানিতে বসছে অগ্রিম কর।
ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

আগামী ২০২১–২২ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশে কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন করদাতাদের ভোগান্তি আরও বাড়াবে। তাঁদের ওপর করের বোঝাও বাড়াতে পারে। নতুন বাজেটে কর রেয়াতের বিনিয়োগসীমা কমতে পারে। বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা না দিলে গাড়ির ফিটনেস নবায়ন, নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার ফলমূল ও সবজি আমদানির ওপর অগ্রিম কর আরোপ হতে পারে। অন্যদিকে ভ্যাট রিটার্নের পাশাপাশি আর্থিক বিবরণী জমা দেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

প্রথমেই দেখা যাক, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য এবারের বাজেটে কী ধরনের খড়্গ নামছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬২ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) আছেন। ক্রেডিট কার্ডধারী ও জমি বেচাকেনা করলে করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাকি সবার রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর গড়ে ২৫ লাখের মতো করদাতা রিটার্ন দেন। ১০-১২ লাখ করদাতা শুধু ক্রেডিট কার্ড নেওয়া এবং জমি বেচাকেনার জন্য টিআইএন নেন। বাকি ২৫ লাখের মতো টিআইএনধারী থাকলেও বার্ষিক রিটার্ন দেন না। তারা এনবিআরের ভাষায় নন-ফাইলার। এসব টিআইএনধারী যাতে রিটার্ন দেন, সে জন্য এনবিআর কঠোর অবস্থানে থাকবে—এমন ঘোষণা থাকবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। এবারে বাড়তে পারে জরিমানার পরিমাণও।

গাড়ির ফিটনেস নবায়ন ও নিবন্ধন নেওয়ার পাশাপাশি ঠিকাদারির দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আগে শুধু টিআইএন সনদ লাগত। আগামী বাজেটে এসব সরকারি সেবা নিতে রিটার্ন জমার রসিদও বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।

একজন করদাতা তাঁর আয়ের একটি অংশ সরকার–নির্ধারিত কিছু খাতে (যেমন সঞ্চয়পত্র, শেয়ারবাজার, প্রভিডেন্ড ফান্ড, এফডিআর ইত্যাদি) বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত পান। সে অনুযায়ী এখন একজন করদাতা তাঁর আয়ের ২৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন। আগামী বাজেটে এই বিনিয়োগসীমা কমিয়ে ১ কোটি টাকা করা হতে পারে। ফলে পয়সাওয়ালা করদাতাদের বিনিয়োগের সুযোগ কমবে। বর্তমানে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হলে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ এবং ১৫ লাখ টাকার বেশি আয় হলে এই হার ১০ শতাংশ।

সম্পদশালী বড় লোকের জন্য আগামী বাজেট বেশি অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ, সারচার্জের স্তর পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। একটি স্তর কমানো হচ্ছে। সারচার্জের নতুন স্তর এরকম হতে পারে—তিন কোটি টাকা পর্যন্ত কোনো সারচার্জ দিতে হবে না; তিন কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ; ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ; ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ; ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ৩০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ হলে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হবে। বর্তমানে ২০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ হলে ৩০ শতাংশ আয়করের ওপর ৩০ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। এবারে অতি ধনী অর্থাৎ ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদশালীদের ওপর আগের চেয়ে বেশি সারচার্জ আরোপ হতে পারে।

বড় মৎস্যচাষিদের জন্য আগামী বাজেট দুঃসংবাদ বয়ে আনতে পারে। বর্তমানে এই খাত থেকে ২০ লাখ টাকার বেশি আয় হলে ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। নতুন বাজেটে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় হয়, এমন মৎস্যচাষিরা ১০ শতাংশ করের সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু বছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় হলেই ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। অবশ্য এই খাতে প্রথম ১০ লাখ টাকা আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হবে না। ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়েও আগের মতো ৫ শতাংশ কর বসবে।

বিদেশি ফল ও সবজি আমদানির খরচ বাড়তে পারে। দেশে এখন চুকোলি, অ্যাসপারাগাস, চেরি টমেটো, রঙিন ক্যাপসিকাম, সেরেলিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিনব বিদেশি সবজির আমদানি হয়। এই সবজি এখন রাজধানীসহ বিভিন্ন সুপারশপে অহরহ মেলে। এ ধরনের সবজি আমদানির ওপর এখন কোনো অগ্রিম কর নেই। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে এই ধরনের সবজির আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর বসানো হতে পারে।

রাজধানীর বাজারে এখন নানা ধরনের বিদেশি রসাল ফল পাওয়া যায়। সুপারশপের পাশাপাশি বড় পাইকারি বাজারে বিদেশি আপেল, নাশপাতি, কমলা, মালটার পাশাপাশি নানা জাতের তরমুজ, হাম্মাম, ড্রাগন, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরিসহ বাহারি ফল পাওয়া যায়। এসব বৈচিত্র্যময় ফল আমদানিতে এত দিন কোনো অগ্রিম কর বসানো হতো না। আগামী বাজেটে ৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম কর বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।

ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য খারাপ খবর আসতে পারে। প্রতি মাসে শুধু ভ্যাট রিটার্ন দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। বর্তমানে আর্থিক বিবরণীর বাধ্যবাধকতা নেই। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হতে পারে। এক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন ছয় মাসের মধ্যে ভ্যাট কার্যালয়ে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।

Loading...