খাবার জুটছে না কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়াগুলোর, এক মাসে ২১টির মৃত্যু

দিপালী ঘোস কক্সবাজার প্রতিনিধি প্রকাশ: ২৮ মে, ২০২১

কক্সবাজার শহরের সৈকত সড়কে ঘোড়া নিয়ে ছুটছে দুই শিশু। আজ শুক্রবার দুপুরে

শুক্রবার বেলা ১১টা। কক্সবাজার সৈকত সড়কের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের সামনের সড়কে ঘোড়া নিয়ে ছুটছে দুই শিশু। ঘোড়া থামিয়ে শিশুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—কোথায় যাচ্ছে? ঘোড়ার পিঠে বসে শিশু ইমাম হোসেন (১২) বলে, ‘স্যার, শহরের কোথাও ঘাস নাই। পর্যটন করপোরেশনের একটি মোটেলের মাঠে কিছু ঘাস আছে, সেখানে ঘোড়া নিয়ে যাচ্ছি। নইলে না খেয়ে মরবে ঘোড়া।’

একটু দূরে বালিকা মাদ্রাসা সড়কে দেখা গেল অভুক্ত দুটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন ঘোড়াগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ঘোড়া নড়ে না। ঘোড়া দুটি মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়ার মালিকেরও দেখা নেই। একই সময় শহরের বাইপাস সড়কের পুলিশ লাইনস এলাকায় দেখা গেল আরেকটি ঘোড়া। ঘোড়ার এক চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, চোখও লাল। সম্ভবত কেউ চোখে আঘাত করেছে। এই ঘোড়ার মালিকও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের স্টেডিয়াম এলাকায় দেখা গেল, আরেকটি ঘোড়া রাস্তায় পড়ে আছে। ঘোড়ার শরীরের আঘাতের চিহ্ন। শিশু–কিশোরেরা ঘোড়াটিকে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু অভুক্ত থেকে দুর্বল হয়ে পড়া ঘোড়াটি নড়াচড়া করছে না মোটেও।

এসব ঘোড়ার পিঠে চড়ে কক্সবাজারে আসা পর্যটকেরা এদিক–ওদিক ঘুরতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শোভাযাত্রা, সিনেমার শুটিং, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা, বিয়েশাদি, খেলাধুলার আয়োজনে ডাক পড়ত। কিন্তু গত বছরের মার্চে লকডাউন শুরু হলে ঘোড়াগুলো নিয়ে বিপাকে পড়েন মালিকেরা। গত ১৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম দফার লকডাউনের টানা পাঁচ মাসে খাদ্যসংকটে পড়ে তখন ৪০টির বেশির ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছিল। গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে আবার লকডাউন। এরপর আবার শুরু হয়েছে খাদ্যসংকট। গত এক মাসে খাবারের অভাবে ২১টি ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতি।

ঘোড়া মালিক সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমিতির সদস্যসংখ্যা ২১। দুই মাসে আগেও ২১ জনের ঘোড়া ছিল ৯১টি। গত এক মাসে মারা গেছে ২১টি। বর্তমানে শহরের ঘোড়া আছে ৭০টি। অধিকাংশ ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রাস্তায়। সড়কের পাশে, বাঁকখালীর নদীর তীরে যতটুকু ঘাস পায় খাচ্ছে, কিছু ঘোড়া খেয়ে ফেলে প্লাস্টিক বর্জ্য, পলিথিন। অভুক্ত থেকে, দুর্বল হয়ে, গাড়ির ধাক্কা কিংবা চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে ঘোড়া। ঘোড়ার খাবার জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মালিকেরা।

ঘোড়াটির চোখে আঘাতের চিহ্ন। লাল চোখ দিয়ে ঝরছে পানি। কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কের পুলিশ লাইনস এলাকায়

ঘোড়াটির চোখে আঘাতের চিহ্ন। লাল চোখ দিয়ে ঝরছে পানি। কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কের পুলিশ লাইনস এলাকায়

ঘোড়া মালিক সমিতির সভাপতি আহসান উদ্দিন। শহরের পেশকারপাড়ায় তাঁর বাড়ি। আহসানের ঘোড়া আছে ১৩টি। তাঁরও দুটি ঘোড়া মারা গেছে। আহসান উদ্দিন বলেন, একটি ঘোড়ার খাবারের বিপরীতে (তিন বেলা খাবার হিসাবে ছোলা, ভুসি, নিম্নমানের গুড় এবং ঘাস) দৈনিক খরচ হয় ৩৫০ টাকা। লকডাউনে সবার আয়রোজগার বন্ধ। ফলে মালিকপক্ষ অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ঘোড়াগুলোকে খাবার জোগাতে পারছেন না। এ কারণে নিজের ১৩টি ঘোড়াগুলোও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।

শহরের সমিতিপাড়ার বাসিন্দা মো. আলমের ঘোড়া ছিল ১৫টি। গত ১৫ দিনে মারা গেছে চারটি ঘোড়া। আরও তিনটি ঘোড়া অসুস্থ দাবি করে মো. আলম (৪৫) বলেন, ‘লকডাউনে সংসার চালাতে পারছি না, ঘোড়ার খাবার জোগান দেব কোত্থেকে?’ এখন তিনি ঘোড়াগুলো রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছেন।

কক্সবাজার সৈকতে ঘোড়া পরিচালনার জন্য একজন করে লোক রাখা হয়। দিনে তাঁরা ২০০-৩০০ টাকা মজুরি পান। ঘোড়ার দৌড়ঝাঁপ বন্ধ থাকায় প্রায় ৭০ জন ঘোড়সোয়ারও বেকার।

সমিতিপাড়ার ফরিদা বেগমের ঘোড়া আছে ১০টি। ইতিমধ্যে মারা গেছে ৮টি ঘোড়া। বাকি দুই ঘোড়ার খাবার সংগ্রহে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঘোড়া মারা যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ফরিদা বেগম (৩৫) বলেন, ঠিকমতো খাওয়ানো যাচ্ছিল না, তাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। রাস্তায় গাড়ির ধাক্কায়, লোকজনের আঘাতে, কেউ শত্রুতাবশত বিষ খাইয়ে, আবার রাস্তাঘাটের প্লাস্টিক বর্জ্য খেয়েও ঘোড়াগুলো মারা গেছে। বেশির ভাগ ঘোড়া মারা গেছে অপুষ্টিতে ভুগে।

ঘোড়া মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদা বেগম বলেন, করোনার সংক্রমণ রোধে গত ১ এপ্রিল থেকে সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ করে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার পর্যন্ত টানা দুই মাস সৈকত ফাঁকা। ঘোড়ার খাবার সংগ্রহের জন্য ২০ দিন আগে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ফরিদা বেগম। ঋণের টাকাও শেষ। এখন ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি তিন হাজার টাকা পরিশোধ করতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ফরিদা বেগম বলেন, ১০-১৫ দিন আগে জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিটি ঘোড়ার জন্য আড়াই বস্তা ভুসি ও এক কৌটা পাতার মিড়া (গুড়) দেওয়া হয়েছিল। ওই খাদ্যে প্রতিটি ঘোড়ার পাঁচ-ছয় দিন চলেছে। এরপর ঘোড়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। ঘোড়াগুলোর বয়স ৩ থেকে ১৫ বছর।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, বাণিজ্যিক কাজের জন্য ঘোড়াগুলো আনা হয়েছে। এত দিন ঘোড়ার আয় দিয়ে মালিকপক্ষ সংসার চালিয়েছে। কিন্তু ঘোড়াগুলোকে তাঁরা (মালিক) ঠিকমতো খাবার দেয়নি। এ কারণে অপুষ্টিতে ভুগছে ঘোড়াগুলো। লকডাউনের এই সময়ে বেওয়ারিশ ঘোড়াগুলো শহরের অলিগলি, পথেঘাটে ঘুড়ে বেড়াতে দেখা যায়। দুর্ঘটনায় কিছু ঘোড়া আহতও হচ্ছে। বেশির ভাগ ঘোড়া অপুষ্টিতে নানা রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে। মারা যাওয়া ঘোড়া নিয়ে কেউ হাসপাতালে আসছে না, ফলে ঘোড়ার ময়নাতদন্তও হচ্ছে না।

বিপাকে ঘোড়া পরিচালনাকারীরাও

কক্সবাজার সৈকতে ঘোড়া পরিচালনার জন্য একজন করে লোক রাখা হয়। তাঁদের দৈনিক এক বেলা নাশতা ও দুই বেলা খাবার মালিকপক্ষকে বহন করতে হয়। এরপর দিনে পরিশোধ করতে হয় ২০০-৩০০ টাকা মজুরি। ঘোড়ার দৌড়ঝাঁপ বন্ধ থাকায় প্রায় ৭০ জন ঘোড়সোয়ারও বেকার। তাঁদের ৬০ শতাংশ আবার শিশু।

দুপুরের প্রচণ্ড দাবদাহে ঝাউবাগানের ভেতর থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে সড়কের দিকে আসছিল ১০ বছরে শিশু ওমর ফারুক। গরমে ঘোড়াটি হাঁপাচ্ছে, শিশুর চেহারাও মলিন। কোথায় যাচ্ছ জানতে চাইলে শিশুর জবাব, ‘ঘোড়াকে পানি খাওয়াব, আমিও খাব।’

ওমরের বাড়ি সমিতিপাড়ায়। ছয় মাস আগে এলাকার ছেলেদের কাছে ঘোড়া চালনা শিখেছে সে। এরপর নেমে পড়ে আয়রোজগারে। ঘোড়ার চেয়ে খাটো ওমর। দৌড়ানোর আগে তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিতে হয়। সারা দিন ঘোড়া দৌড়িয়ে যা আয় হবে, তা থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন পাবে ওমর। অর্থাৎ ১ হাজার টাকা আয় করলে সে পাবে ৩০০ টাকা। কিন্তু গত এক মাসে তার ১০০ টাকাও আয় হয়নি। তাহলে এত ঝুঁকি নিয়ে ঘোড়া চালাও কেন? শিশু ওমরের জবাব, ‘ঘরে অসুস্থ মা আর ছোট দুই বোন। ওরা না খেয়ে থাকলে কষ্ট বাড়ে, ঘরে থাকতে পারি না।’

ওমরের মতো অনেক শিশুর কাঁধে এখন পরিবারের বোঝা। তারা প্রতিদিন সকালে ঘোড়া নিয়ে মাঠে নামছে, সন্ধ্যায় অভুক্ত ঘোড়ার সঙ্গে তারাও ফিরছে বাড়িতে, খালি হাতে। এভাবে কত দিন?

আরেক শিশু ইমাম হোসেন বলে, ঘোড়ার মতো তাদের পেটেও খাবার জোটে না। ঘরে অসুস্থ মা, চার ভাই দুই বোন। দুই বছর আগে বাবা মারা গেছেন। মা হাঁপানি রোগী। তার একমাত্র বড় ভাইটিও বাক্‌প্রতিবন্ধী। পরিবারে আয়রোজগারের আর কেউ নেই জানিয়ে ইমাম হোসেন বলে, সৈকতে পর্যটক থাকলে ঘোড়া চালিয়ে দৈনিক ২০০ টাকা পাওয়া যায়। তা দিয়ে চলে টানাপোড়েনের সংসার। এখন আয় নেই, সংসারও চলে না।

Loading...