৩৭ জেলায় নেই আইসিইউ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছেলের হাতে হাত রেখে হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলেন। পারেননি। বলবেন কী করে? মুখে তো অক্সিজেন মাস্ক। দুই-তিনজন ছোটাছুটি করছেন হাসপাতালে ভর্তির জন্য। কিন্তু সে তো সহজ কথা নয়! ততক্ষণে অক্সিজেনের স্যাচুরেশন মাপা হলো। ৬০-৬৫-তে ওঠানামা করছে। অ্যাম্বুলেন্সেই থাকতে হলো প্রায় ৪০ মিনিট। তারপর ভর্তির সৌভাগ্য হলো। কিন্তু আর বেঁচে থাকা হলো না। নাটোরের সিংড়া বিলহালতী ত্রিমোহনী অনার্স কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বেলালুজ্জামান গত মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে অনেকের করতে হচ্ছে প্রাণান্তকর চেষ্টা। এই মুমূর্ষু সময়ে মিলছে না আইসিইউ। সীমান্ত ও আশপাশের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা সংক্রমণ। কিন্তু এখনো দেশের ৩৭ জেলায় নেই করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা। এ জন্য শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রোগী নিয়ে বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা। হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে ভিড়, রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আইসিইউর জন্য রোগীর দীর্ঘ সিরিয়াল। একজন মারা গেলে আরেকজনকে বাঁচাতে নেওয়া হচ্ছে আইসিইউতে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৭টিতেই করোনা চিকিৎসার জন্য আইসিইউ নেই। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৫টি, চট্টগ্রামের ৮টি, রংপুরের ৬টি, সিলেটের ২টি, বরিশালের ৪টি, খুলনার ৪টি, রাজশাহীর ৬টি ও ময়মনসিংহের ২টি জেলা রয়েছে। সারা দেশে মোট আইসিইউ শয্যা সংখ্যা ২ হাজার ৪২০টি। এর মধ্যে ১ হাজার ২১৮টি ঢাকা মহানগরে এবং ৫৯টি চট্টগ্রাম মহানগরে। বাকি ১ হাজার ১৪৩টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে ২৫টি জেলায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম বাদে বিভিন্ন জেলায় ‘হাই ফ্লো নেজাল ক্যানুলা’ সংবলিত আইসিইউ সমতুল্য শয্যা আছে ১ হাজার ৬০৩টি। ১১টি জেলায় তেমন শয্যাও নেই। করোনা রোগীর চাপ সামলাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেসামাল হয়ে পড়েছে। সাধারণ ওয়ার্ডগুলো একের পর এক করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তর করছে; সম্প্রসারণ হতে হতে এখন হাসপাতালের এক-চতুর্থাংশ করোনা ইউনিটে রূপ নিয়েছে। তারপরও  সংকুলান করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এমন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেলে একটি আইসিইউ বেডের আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন রোগীরা। পরিস্থিতি এমন যে, একটি আইসিইউ খালি পেতে অন্তত ৭০ জন রোগী সিরিয়ালে আছেন।

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ৩০টি বেডের মধ্যে এখন ২০টিতে করোনা রোগী বা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন। এরপরও সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। করোনা ওয়ার্ডে রোগী বেড়েই চলেছে। আইসিইউতে বেড পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দিনের পর দিন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইসিইউ পেতে নাম লেখানো রোগীর ক্রমিক ৭০ পর্যন্ত উঠেছে। আইসিইউতে থাকা রোগীদের কারও একটু উন্নতি হলে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হচ্ছে। আবার কেউ মারা গেলে শয্যা খালি হচ্ছে। তারপর ক্রমিক অনুযায়ী ফোন করে আইসিইউতে রোগী ডাকা হচ্ছে।

প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ জন পর্যন্ত রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ক্রমিকের ৭০ নম্বর রোগীকে আইসিইউ পেতে কয়েক দিন অপেক্ষা করার বিকল্প থাকছে না। আইসিইউতে গতকাল রোগী ছিল ২০ জন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর মতো অবকাঠামো নেই বলে জানিয়েছেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের আইসিইউ বাড়ানোর মতো আর কাঠামোগত সক্ষমতা নেই। যা ছিল সবই করলাম। এখন আইসিইউ বেড ২০টি। এখানে বেড পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার বিকল্প নেই। কারণ রোগীর চাপ অনেক বেশি; কেউ সুস্থ বা মারা না গেলে অন্যজনকে বেড দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ রাজশাহী মহানগরীতে সংক্রমণ বাড়ছে, সেই চাপ তো আছেই। আশপাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা  ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ থেকেও করোনা আক্রান্ত রোগী চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে সবাই ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না।

আমাদের চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গা জেলায় কোথাও আইসিইউ না থাকায় অনেকের মধ্যে শঙ্কা দেখা যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে জেলায় দৈনিক সংক্রমণের হার ৪৩-৬৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। যার বেশির ভাগ রোগী চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদা উপজেলায়। অধিক সংক্রমণের কারণে জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে দামুড়হুদা উপজেলাকে লকডাউন ঘোষণা করেছে। চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে পর্যাপ্ত শয্যা এবং অক্সিজেন ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও আইসিইউ বা সিসিইউ নেই। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘লোকমোর্চা’র সভাপতি অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন বলেন, ইতিপূর্বে যেসব করোনা রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়েছে, বাধ্য হয়েই তাদের অন্য জেলায় রেফার্ড করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ডা. আওলিয়ার রহমান জানান, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবাদানের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা আছে। পাশাপাশি ৫৪টি বড় এবং ১৪৫টি ছোট সিলিন্ডার প্রস্তুত আছে। চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান জানান, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার ভবন রয়েছে। সেটিকে কার্যকরভাবে চালু এবং অন্তত একটি আইসিইউ স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি মো. রফিকুল আলম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ও সিসিইউ না থাকায় করোনা রোগীর মৃত্যুর হার বাড়ছে। জেলা স্বাচিপ সভাপতি ও বিএমএর সাধারণ সম্পাদক ডা. গোলাম রাব্বানী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে যে হারে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে তাতে দ্রুত আরটি-পিসিআর ল্যাব এবং আইসিইউ ও সিসিইউ স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে। মুমূর্ষু রোগীদের রাজশাহী পাঠানো হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, করোনা মহামারীর ১৩ মাসেও চালু হয়নি সিরাজগঞ্জের সরকারি হাসপাতালের চারটি ভেন্টিলেটর-আইসিসিইউ সেবা। এতে করোনা রোগীর চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় আইসিইউ চালু করা যাচ্ছে না। সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা কমিটির নেতা নবকুমার কর্মকার জানান, করোনা সংকটের মধ্যে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ চালু না করা স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতির বড় প্রমাণ। সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ভেন্টিলেটরগুলো অব্যবহৃত রয়েছে।

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। কিন্তু সংক্রমণ শনাক্তে নেই আরটি-পিসিআর ল্যাব, মুমূর্ষু রোগীর জন্য নেই আইসিইউর ব্যবস্থা। ঝিনাইদহের মানুষ জেলায় পিসিআর ল্যাব ও আইসিইউ স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।

Loading...