হাওরের ঐতিহ্য ঢপযাত্রা

ঢপযাত্রা হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি। এটি ধর্মীয় যাত্রাগানের এক বিশেষ ধারা। নব্বই দশকের শুরু থেকে হাওরাঞ্চলে ঢপযাত্রার প্রসার ঘটে। এ ধারা গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঐতিহ্য-পরম্পরায় সজীব ও প্রাণবন্ত। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোর হিন্দু-অধ্যুষিত বিভিন্ন গ্রামে ঢপযাত্রার আধিক্য রয়েছে।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের বাসিন্দা রিবেন তালুকদার । ঢপযাত্রার সুপরিচিত নাট্যাভিনেতা হিসেবে পরিচিত। রিবেন জানালেন, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে ‘ধর্মীয় যাত্রাগান’ বলে যে ধারা প্রচলিত আছে, সেটাই হাওরাঞ্চলে ঢপযাত্রা হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জয়বাবা লোকনাথ নাট্য সংঘ। ১৯ সদস্যের দলটি এ পর্যন্ত কৃষ্ণের করুণা, ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা, মহাবীর পরশুরামসহ ২৫টি ঢপযাত্রার একাধিক মঞ্চায়ন করেছেন। পৌষ মাসে হাওরে কৃষিকাজের সময়টুকু ছাড়া বাকি ১১ মাস তাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টাকার বিনিময়ে ঢপযাত্রা মঞ্চায়ন করে থাকেন। তবে মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে এসব পরিবেশনা বেশি হয়ে থাকে। এর বাইরে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা, শ্রদ্ধানুষ্ঠান, জন্মাষ্টমীসহ নানা পূজা-পার্বণে ঢপযাত্রার আয়োজন করা হয়।

রিবেন জানালেন, দুর্গাপূজায় সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার দুটি পূজামণ্ডপে তাঁর দল ঢপযাত্রা পরিবেশন করেছে। তাঁদের দল ছাড়াও হাওরাঞ্চলে ঢপযাত্রার পেশাদার ও শৌখিন অসংখ্য দল আছে। এসব দলের সদস্যরা পূজা-পার্বণে হিন্দুধর্মীয় কাহিনি নিয়ে নানা ধরনের ঢপযাত্রা পরিবেশন করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে ঢপযাত্রার জনপ্রিয়তা তৈরি হওয়ায় এই অঞ্চলে ঢপযাত্রার অসংখ্য লেখকও তৈরি হয়েছেন। এসব ঢপযাত্রা এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁরা পরিবেশন করেন।

বিভিন্ন গবেষকের তথ্যানুযায়ী, বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীনতম ধারা হলো যাত্রাগান। এ ধারা লোকনাট্যের পর্যায়ে পড়ে। তবে কালপরিক্রমায় যাত্রাগান চেহারা পাল্টে নানা ধারায় বিভক্ত হয়েছে। এসব বিভক্তির মধ্যে উপস্থাপনরীতি ও আঙ্গিকগত তেমন বৈসাদৃশ্য না থাকলেও কাহিনি ও বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ তফাত দেখা যায়। পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে লেখা যাত্রাগানের পাশাপাশি প্রণয়োপাখ্যান, সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, লোককাহিনিভিত্তিক নানা বিষয়কে ঘিরে লেখা যাত্রাগানের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
ঢপযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক অভিনেতা জানান, হাওর-অধ্যুষিত জেলা-উপজেলাগুলোতে যাত্রাগানের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হাওরাঞ্চলের হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রামে যাত্রাগানের পাশাপাশি ধর্মনির্ভর পৌরাণিক কাহিনিকেন্দ্রিক যাত্রাগান ব্যাপকভাবে পরিবেশিত হয়। এসব যাত্রাগানকেই হাওরবাসী ‘ঢপযাত্রা’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। খোলা আকাশের নিচে কিংবা বাড়ির উঠানে ঢপযাত্রা পরিবেশনের অস্থায়ী মঞ্চ নির্মিত হয়। সাধারণত রাতের বেলা এ আয়োজন করা হয়। বাঁশের খুঁটি পুঁতে ত্রিপল টাঙিয়ে মঞ্চ নির্মাণ এবং মাটিতে খড় অথবা পাটি বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা রাখা হয়। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, সেখানে হ্যাজাক বাতির মাধ্যমে আলোকসজ্জা করা হয়। গ্রামের শৌখিন মানুষেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী সেজে ঢপযাত্রায় অংশ নেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পেশাদার দলকেও পরিবেশনায় নিযুক্ত করা হয়। মঞ্চের একেবারেই পাশের কোনো ঘরে আগে থেকেই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বসে থাকেন। সেখান থেকে নির্মিত মঞ্চে দৌড়ে এসে অভিনয়ে অংশ নেন। ঢপযাত্রায় হারমোনিয়াম, ঢোল, বাঁশি, খোল, দোতারা, ডুগি, তবলা, করতাল, মন্দিরা, মৃদঙ্গ, জুড়িসহ নানা ধরনের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়।

ঢপযাত্রার লেখকেরা গ্রামীণ সাধারণ মানুষেরাই। বর্তমান সময়ে ঢপযাত্রার একজন পরিচিত লেখক হচ্ছেন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের সুনীল চন্দ্র দাস । তিনি ১৯টি ঢপযাত্রার রচয়িতা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.