সৌদিতে প্রতারণা; শ্রমিকদের টাকা দেয়নি ট্রাভেল শপ

সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিকদের কোয়ারেন্টিন প্যাকেজ নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতির রেশ কাটেনি এখনো। কারণ, কোয়ারেন্টিন প্যাকেজের নামে শ্রমিকদের পকেট থেকে আগাম কেটে নেয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। কিন্তু টাকার তুলনায় সেবা দেয়া হয়নি। পদে পদে হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে শ্রমিকদের। তিনবেলা খাবারও জোটেনি ঠিকমতো। আর এ কাজটি করেছে ট্রাভেল শপ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

বিমান বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করলেও এক কথায় চুক্তিভঙ্গ করে শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করেছে ট্রাভেল শপ। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শ্রমিকদের টাকা ফেরত দেয়নি তারা। চুক্তিভঙ্গের দায়ে কোন শাস্তি হয়নি তাদের।

ট্রাভেল শপের প্রতারণার কথা নতুন নয়। শুধু সৌদিতেই শত শত শ্রমিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ জমা পড়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও আজো বহাল তবিয়তে ব্যবসা করে যাচ্ছে ট্রাভেল শপ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সৌদি এয়ারলাইন্স সৌদি হলিডেজ এর মাধ্যমে নির্বাচিত হোটেলের ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে ১৫০০-২৫০০ সৌদি রিয়েল এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কোয়ারেন্টাইন প্যাকেজ প্রদান করছে। সৌদি হলিডেজ এর কোয়ারেন্টাইন প্যাকেজ বাবদ প্রত্যেক যাত্রীর খরচ পড়ছে বাংলাদেশি টাকায় ৩৩ হাজার থেকে ৫৭ হাজার টাকার মধ্যে।

অথচ, ট্রাভেল শপ বিমান হলিডেজ প্রবাসী শ্রমিকদের নিম্ন মানের হোটেলে ডাবল রুমে রাখলেও প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেখানে প্রকৃত খরচ ১৬ হাজার ৫শ টাকা। (ডাবল রুমে দুইজনের খরচ ৩৩ হাজার টাকা। একজনের খরচ ১৬ হাজার ৫শ টাকা।)

এই হিসেব বলে দেয়, ট্রাভেল শপ বিমান হলিডেজ এর মাধ্যমে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে কমিশনের বাইরেও ৬১ হাজার ৫ শ টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। একহাজার যাত্রী হলে কত টাকা হাতিয়েছে তারা? হিসেব বলছে, প্রায় ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ট্রাভেল শপের শীর্ষ কর্মকর্তা আনাম এবং মো. শফিউদ্দিন একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও নানা কৌশলে, নামে/বেনামে ব্যবসা করে যাচ্ছে তারা। বিমান বাংলাদেশ থেকে আবারো কোয়ারেন্টিন প্যাকেজ নিয়ে ব্যবসা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে ট্রাভেল শপ। নানা মহল থেকে লবিং, তদবির অব্যাহত রেখেছে। যেখানে শাস্তি পাওয়ার কথা, প্রতারিত শ্রমিকদের টাকা ফেরত দেয়ার কথা, সেখানে আধিপত্য ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় নেমেছে ট্রাভেল শপ।

এদিকে, সৌদি প্রবাসী ভুক্তভোগীরা জানান, ডাবল রুমে একজনের পরিবর্তে দুইজনকে থাকতে বাধ্য করেছে ট্রাভেল শপ। শুধু তাই নয়, তাদেরকে যে সব হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখার কথা ছিলো সে সব হোটেলে না রেখে আরও নিম্নমানের হোটেলে রাখার অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি এ প্যাকেজের আওতায় খাবার সরবরাহের কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি।

প্রতারণার শিকার হওয়ার পর থেকে দরজায় দরজায় ঘুরেও ন্যায়বিচার পাননি তারা। টাকা ফেরত দেয়নি ট্রাভেল শপ। উল্টো নানান ভয়-ভীতি দেখায়।

শ্রমিকদের আরো অভিযোগ, দূতাবাস এবং বিমানের কিছু কর্মকর্তারাও ট্রাভেল শপের সাথে জড়িত। সরকার তদন্ত করলেই পুরো বিষয়টি বের হয়ে আসবে। চক্রটি বিমানের সুনাম নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে।

জানিয়েছেন, কোয়ারেন্টাইনে থাকা ও খাওয়া বাবদ সৌদিতে গমনেচ্ছু প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে টিকিট কেনার সময়ই টিকিটের দামের সাথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স অতিরিক্ত ৩৪০০ সৌদি রিয়েল (এস আর) আদায় করেছে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭৮ হাজার টাকা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এতো টাকা বিমানকে দেয়ার পরও সৌদি আরবে এসে কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় যে সকল সুযোগ সুবিধা দেবার কথা ছিলো তার কোনটাই তারা ঠিকমতো পাননি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরও ট্রাভেল শপের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সাথে এতো বড় ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ নীরব থেকেছে।

কিছু অসাধু বিমান কর্মকর্তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি শ্রমিকদের মাঝে হতাশা তৈরি করেছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সৌদিআরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৭ মে ২০২১ সোমবার করোনা মোকাবিলা সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন প্যাকেজ ঘোষণা করে। নির্দেশনা মোতাবেক ২০ মে ২০২১ তারিখ থেকে সৌদি আরবে আগত সমস্ত অ-নাগরিক যাদের কোভিড-১৯ এর টিকা দেয়া হয়নি; তাদের কমপক্ষে সাত দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা হয়।

একই সাথে একটি কোয়ারেন্টাইন প্যাকেজ প্রদান করা হয় প্যাকেজ অনুযায়ী সাত দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন এর সাথে (৮) বয়সের কম যাত্রী ব্যতীত সমস্ত অতিথিদের আগমণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এবং আগমণের ৭ দিনের মধ্যে দুটি পিসিআর টেস্ট করতে হবে। এই দুই টেস্ট এর ফলাফল নেতিবাচক হলে, তাদের ৮তম দিন তারা কোয়ারেন্টাইন থেকে মুক্ত হতে পারবে। এছাড়া স্বাস্থ্যবীমাসহ আরও বেশকিছু নির্দেশনা জারি করা হয়।

Loading...