ন্যূনতম যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করে ফিরে আসুক সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ

সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকারের নিকট আবেদন।

মোঃ নিজাম উদ্দিন খানঃ সবসময় শুনে থাকি সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি সরকার খতিয়ে দেখছে। দেশের প্রচলিত কোনো আইন বা নীতিমালায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতার কোনো মানদণ্ড নেই। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন-১৯৭৪ সংশোধন করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে সবসময় শুনে থাকি কিন্তু সেই শুনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তবে সিনিয়র যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক্স মিডিয়ায় সুনামের সহিত কাজ করে আসছেন তারা ব্যতিত নতুন যারা এই পেশায় যুক্ত হতে চাই প্রেস কাউন্সিলের উচিত নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারন করে দেওয়া। তা নাহলে সাংবাদিকতার এই মহান পেশা থেকে মহান মানুষগুলো হারিয়ে যাবে একসময় দেশে গুনি/দক্ষ সাংবাদিকের অভাব দেখা দিবে যা একটি রাস্ট্র বা দেশের জন্য অশনিসংকেত।

সাংবাদিক হতে হলে যে একটু পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণের দরকার আছে সেটা সবাই স্বীকার করলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বললে অনেকে ক্ষেপে যান। যাচাই বাচাই সাপেক্ষে সিনিয়র সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে, নতুনদের জন্য নুন্যতম যোগ্যতা নির্ধারন করা হোক। আশা করি সরকার বাস্তবায়ন করার লক্ষে এই বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা করবে। দুনিয়ায় এমন কোনো পেশা নেই যেখানে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের দরকার হয় না। বাংলাদেশেই শুধু সাংবাদিকতা করতে হলে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণ লাগে না। যেখানে একজন সরকারী ড্রাইভার/পিয়ন/মালী ও প্লাম্বার মিস্ত্রী হতে হলে নুন্যতম যোগ্যতা যদি অষ্টম শ্রেনীর সার্টিফিকেট লাগে সেখানে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যেন সাতখুন মাফ।

সাংবাদিকদের সবচে বড় পদ হল সম্পাদক। এইদেশে পদটি রীতিমত ধর্ষিত ও কলংকিত। ক, লিখতে কলম ভাঙ্গে এমন অনেকেই সম্পাদক বনে গেছেন। তারা সম্পাদক হলেনই বা কী করে, কে তাদের অনুমোদন দিল, এসব নিয়ে আর আলোচনাই হয় না। সম্পাদকদের অনেকেই সম্পাদনা করেন না। তারা টাকার জোরে পত্রিকা প্রকাশ করেন আর আইনের ফাঁকফোকড় গলিয়ে তারা নিজেরাই সম্পাদক হয়ে যান। জীবনে একদিনের জন্যও সাংবাদিকতা করেননি কিন্তু সরকারের কাছে জমা দেওয়া বায়োডাটায় লিখা আছে ১৫ বছর সাংবাদিকতা করেছেন- এই দেশে এমন সম্পাদকের অভাব নেই । যেখানে সম্পাদকদেরই কোনো যোগ্যতা লাগে না সেখানে তার অধীনে সাংবাদিকদের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হাস্যকরই হবে বটে। নিশ্চয়ই এবার সম্পাদক হতে হলেও কমপক্ষে কী কী যোগ্যতা লাগবে সেটিও নির্ধারণের চেষ্টা করবেন সরকার। আর সেই যোগ্যতা কী রকম হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা জরুরি। বিষয়টি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সন্দেহ নেই। তাই অতি শ্রিঘ্রই এব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হওয়া উচিত। সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলদেশ- পিআইবি, প্রেস কাউন্সিল, গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট,এরকম যত প্রতিষ্ঠান রয়েছে সবখানেই এই আলোচনা দরকার। কারণ সাংবাদিকতার মান দিনকে দিন যে নিম্নগামী সেটা বুঝতে কারও গবেষক হওয়ার দরকার নেই, মাঠ পর্যায়ে আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি পেশাটি নীতি নৈতিকতা আর দক্ষতার মাপকাঠিতে অনেকটাই নিচে নেমে গেছে।

আমরা জানি সাংবাদিকদের যোগ্যতা নিয়ে যাচাই বাছাই শুরু হলে অনেকেই নাখোশ হবেন, এক সময় আমিও ভাবতাম শিক্ষাগত যোগ্যতা সাংবাদিকতার জন্য বাধ্যবাধকতা হতে পারে না, কিন্তু আজ সাংবাদিকতা এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেখানে ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আমরা সাংবাদিকরা এই পেশাটির মান মর্যাদা ধরে রাখতে পারছি না। আমাদের মধ্যে প্রচুর অর্ধশিক্ষিত, ক্ষেত্রবিশেষ মূর্খসহ নানা ধান্দাবাজ ঢুকে পড়েছে। তাদের কারণেই সাংবাদিকতার নামে আজ অপসাংবাদিকতা বেড়েছে, দায়িত্বশীলতা কমেছে। রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় সাংবাদিকদের ছড়াছড়ি। পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পার হতে পারেনি কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে শতশত টাউট বাটপার। এসব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার পাশাপাশি ঘরে বসে অনলাইন পোর্টাল খুলে নানা জায়গা থেকে নিউজ কপি পেস্ট করেও শতশত সাংবাদিক নামধারীর জন্ম হয়েছে অনেকে আবার কপি পেস্ট কি বুঝেওনা। যেমন,পানের দোকানদার, চায়ের দোকানি,ডিম ব্যবসায়ী,মুরগী ব্যবসায়ী,মাদককারবারী,হিরোইন্সি
বাটপার ধান্ধাবাজ গলায় কার্ড ঝুলিয়ে এখন সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছে। ফেসবুকিং করে এমন অনেকেই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বাইকের সামনে প্রেস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক সময় শুনতাম ডাক্তার,ইন্জিনিয়ার,শিক্ষক,রাজনীতিবিদ, চাকরিজীবী, আইনজীবী,লেখক,কবি ও ব্যবসায়ীদের মত সাংবাদিকতাও একটি আলাদা পেশা এখন দেখি এটি ক্লাসের চতুর্থ বিষয়ের মত। সব পেশার লোকেরা এখন মুল পেশার সাথে সাংবাদিকতাকে এখন চতুর্থ বিষয় মনে করে, সাংবাদিকতা জানলেও কি না জানলেও কি, অর্থাৎ নিউজ করলেও কি না করলেও কি গলায় তো একটি পত্রিকার কার্ড ঝুলানো আছে। অনেকে জাতীয় কবি নজরুলের উদাহরন দিয়ে বলে উনিওতো এসএসসি পাশ করেনি। তারা আসলে জানেনা কবি নজরুলতো আর সবাই হতে পারেনা,এরা ক্ষণজন্মা একজন কবি নজরুল অনেক বছর পর পর জন্ম হয় একজন কবি নজরুল হতে হলে অনেক সাধনা করতে হয়। রাস্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ ফিরে আনতে হলে এই সমস্ত খোঁড়া যুক্তি ওয়ালা লোকদের হাত থেকে সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে অবশ্যই যোগ্যতার বিষয়টি ভাবতে হবে। এই পেশা সাংবাদিকদের সব সংগঠনের উচিত এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীকে সব রকমের সহায়তা করা এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪ সংশোধন করা। সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন ও পেশার সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতেই এটা করতে হবে নয়তো নকল সাংবাদিকদের ভিড়ে আসল সাংবাদিকদের হারিয়ে যেতে হারিয়ে যেতে আর বেশিদিন সময় লাগবেনা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.