রাশেদ খাঁন ও নুরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে, পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার-নোটিশ

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন ও যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ অভিযোগ এনে তাদের সাময়িক অব্যাহতি দেন সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর। পাশাপাশি তিনি নিজেকে সমন্বয়ক দাবি করেন। রোববার ভোর ৩টার দিকে ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এসব বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন নুরুল হক নুর ও রাশেদ খান। এর আগে রাত একটায় নুর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কমিটি বিলুপ্তি করেন।

আরেক বিজ্ঞপ্তিতে গত ২ জুলাই নুর কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। কমিশন পরিষদের নেতৃত্ব বাছাই করবে। কমিশনের প্রধান করা হয়েছে পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবু হানিফকে। এর বিপরীতে নুরের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করার ওই ঘোষণাকে চরম অসাংগঠনিক কার্যকলাপ আখ্যা দিয়ে রোববার (৪ জুলাই) এক জরুরি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। নুরুল হক নুর স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২ জুলাই বাংলাদেশ ছাত্র, যুব ও শ্রমিক অধিকার পরিষদের এক যৌথ মিটিংয়ে সংগঠনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন ও যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহরাব হোসেনকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। একইসঙ্গে কেন তাদের স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না, তার কারণ দর্শাতে তদন্ত কমিটির কাছে যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদান করার অনুরোধ করা হলো। বিজ্ঞপ্তিতে আব্দুজ জাহেরকে তদন্ত কমিটির প্রধান দেখানো হয়। কমিটির বাকী সদস্যরা হলেন- আবু হানিফ, ঝুনু রঞ্জন দাস, আব্দুর রহমান, মঞ্জুর মোর্শেদ মামুন।

অপরদিকে রাশেদ খাঁন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের উল্লেখিত নোটিশের আলোচনায় কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ নেতা অনুপস্থিত ছিলেন। তাই ওই সভায় সাংগঠনিক কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। পাশাপাশি বাংলাদেশ ছাত্র, যুব ও শ্রমিক অধিকার পরিষদে ‘সমন্বয়ক’ কোন পদই নেই। তাই বাংলাদেশ ছাত্র, যুব ও শ্রমিক অধিকার পরিষদের নামে সমন্বয়ক পদ ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণাকারীর বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা আগামী সাত দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্র অধিকার পরিষদের সব বিশ্ববিদ্যালয়-জেলা-মহানগর ও উপজেলা কমিটিকে বিভ্রান্ত না হয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আহ্বানও জানানো হয়।

সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, নুরুল হক নুর একক আধিপত্য বিস্তার করতেই অসাংগঠনিকভাবে কমিটি বিলুপ্ত করেছেন এবং দলের মূল নেতাদের অব্যাহতি দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে সংগঠন নিশ্চিতভাবে ভেঙে যাবে। যারা এ আন্দোলনকে, এ সংগঠনকে সমর্থন দিচ্ছেন, তারাও মুখ ফিরিয়ে নেবেন। রাকিব হোসেন নামে পরিষদের এক কর্মী ক্ষোভ জানিয়ে ফেসবুকে লিখেন, ছাত্র অধিকার পরিষদ ধ্বংস করার জন্য একচেটিয়া কেউই দায়ী নন। ভিপি, রাশেদ, ফারুক ও কিছু তেলবাজ দায়ী। সত্যিকারে তারা কেউই সংগঠনকে ভালোবাসেন না। যদি অধিকার আদায় করার জন্য সত্যি সংগ্রামে নামতেন, তাহলে অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিয়ে এভাবে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দিয়ে সংগঠন ধ্বংস করতেন না। শাহাদাত হোসেন নামে আরেক কর্মী লিখেন, আমরা তৃণমূল নেতারা সম্পূর্ণ হতাশ, স্বপ্নেও ভাবিনি, এ ধরনের নিউজ পাব। যাই হোক গণতন্ত্রের জয় নিয়ে আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটা এখানেই কবর দিলাম। আর কোনো অনুভূতি নেই আমাদের দেশ ও আপনাদের নিয়ে। আসলে আমরা বেইমান জাতি। সুযোগ পেলে সবাই বেইমানি করেন।

এ বিষয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদের বর্তমান আহ্বায়ক রাশেদ খাঁন বলেন, কমিটি বিলুপ্ত করার এখতিয়ার আছে আহ্বায়কের। আহ্বায়ককে ডিঙিয়ে একজন যুগ্ম আহ্বায়ক এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এ কারণে আমরা তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, তিনি (নুর) যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন, সেটা সম্পূর্ণ অসাংগঠনিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তাকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের উত্তর দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তার সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে আলোচনা হবে।

নুরুল হক নুর বলেন, গত পরশু (২ জুলাই) মিটিংয়ে একটা সিদ্ধান্ত হয় যে, এবার পরিষদের পূর্ণাঙ্গ একটি কমিটি করা হবে। সবার আলোচনার ভিত্তিতে আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এছাড়া অঙ্গ সংগঠনগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য একটি ডিসিপ্লিনারি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। দুটি বিজ্ঞপ্তিই আমি দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেক সংগঠনে দু-একজন চান, নিজের মেয়াদ একটু ধরে রাখতে। আমি দেখেছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় রাশেদ খাঁন মিটিংয়ের বিষয়টি অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি প্রেস রিলিজ দিয়েছেন। এটা হয়তো তার ব্যক্তিগত রাগ ক্ষোভের জায়গা থেকে। আমি যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি, সেটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।

কাউকে অব্যাহতি কিংবা কমিটি বাতিল করার এখতিয়ার রাখেন কি না – এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক নুর বলেন, স্বাভাবিকভাবেই অনেক দেশেই লিখিত সংবিধান নেই। কিন্তু সেসব দেশেও তো কার্যক্রম চলে। অনেক কিছু আইনে নেই, কিন্তু বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গঠনতন্ত্র না থাকলেও আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ভিত্তিতে সংগঠন পরিচালনা করতে হয়। আমি মনে করি, সংগঠনের যারা নেতৃস্থানীয় ও দায়িত্বশীল, তারা যেকোনো বিষয়ে একমত হলে সেটাতে আর সমস্যা থাকার কথা না। এ ঘটনায় সরকারের ইন্ধন থাকতে পারে উল্লেখ করে নুর বলেন, সরকার বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনে বিশৃঙ্খলা তৈরি, সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে ভাঙন, সুবিধা দিয়ে কাউকে কাউকে কিনে নেওয়া এ ফ্যাসিবাদী সরকারের এজেন্সিগুলোর নিয়মিত কাজ। আমরা এ মুহূর্তে যেহেতু সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছি। সেক্ষেত্রে তাদের ইন্ধনও থাকতে পারে।

Loading...