Ultimate magazine theme for WordPress.

‘তাহলে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট প্রত্যাখ্যান করেছেন?’

ভোটকেন্দ্র দখল করে নৌকার ব্যাচধারীদের উপস্থিতি, পোলিং এজেন্ট ঢুকতে না দেয়া, মারধর করে এজেন্টদের বের করে দেয়া, ভোটারদের ভোট দিতে বাধা, সংঘর্ষ, ইভিএম হ্যাংসহ নানা অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ হয়েছে।

নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করছেন। দুই সিটিতে গড়ে ভোট পড়েছে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। ইসি ও সরকার পক্ষের দাবি- জনগণ স্বতস্ফুর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে।

তবে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচন যেভাবে হয়েছিলো, তা নির্বাচনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করেছে। যার কারণে বড় সংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। তারা জানতেন তাদের মতামত নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে না। প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটারের ভোটে যদি নির্বাচন সুষ্ঠু বলা যায়, তাহলে কি বলা যায় বাকি ৭০ শতাংশ এই ভোট প্রত্যাখ্যান করেছেন?

নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতিও তাদের বিশ্বাস নেই। এ দেশের মানুষ খুবই গণতন্ত্র সচেতন। তারা গণতন্ত্রের জন্যে লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে। এখন সেই অবস্থাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, মানুষ এখন এর প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না।’

আমার ভোটের কোনো মূল্য নেই- এমন ভাবনা মনের মধ্যে আসন করে নিয়েছে। এটি গণতন্ত্রের জন্যে অশনি সংকেত। মানুষ ভোট দিতে যায়নি বা ভোট দিতে যায় না, বা ভোট দিতে যাওয়ার মতো পরিবেশ নেই। এর ফলে মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এটি খুব ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।

মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছিলো। এটি প্রশাসনের পক্ষ থেকেও করা হয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ৩০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে। তাহলে কি বলা যায় বাকি ৭০ শতাংশ এই ভোট প্রত্যাখ্যান করেছেন?- ‘ভোট না দেয়ার মানে হচ্ছে জনগণ ভোটকে গুরুত্ব দেয়নি। ভোট না দিয়ে জনগণ ‘প্যাসিভ রেসিসটেন্স’ করেছে বলা যেতে পারে।’

বিশিষ্ট এই কলামিস্টের ভাস্য, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরও বলেছেন, বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।– ‘বিরোধীদল কি মারপিট করবে? পেশীশক্তি দেখাবে টিকে থাকার জন্যে? আমি মনে করি, বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের সংঘাত সৃষ্টি না করার বিষয়টিও এক ধরণের ‘প্যাসিভ রেসিসটেন্স’। নির্বাচনে সংঘাত যা হয়েছে তা সরকারি দলের লোকেরাই করেছে। এটা তাদের জন্যে লজ্জার।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘গতকালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক হবে না এমনটা অনুমিত ছিলো। কারণ, সাধারণ মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচন যেভাবে হয়েছিলো, তা নির্বাচনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করেছে। যার কারণে বড় সংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। তারা জানতেন তাদের মতামত নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে না।’

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি দলের প্রার্থীরাই নির্বাচনী প্রচারণার দাপটে ছিলো। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানে বিরোধীদলের প্রার্থীদের তৎপরতা খুব বেশি দেখিনি। বিরোধীদলের প্রার্থীদের কোনো পোস্টার ছিলো না এবং সাধারণ মানুষ দেখতেই পারছিলেন নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নেই। যা দেখে বোঝা যায় পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার যে নির্বাচনী পরিবেশ দেখে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাবেন, তা তৈরি করা হয়নি।’

বিশিষ্ট নাগরিকদের সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই নির্বাচন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি আরও একটি পদক্ষেপ। এর পরিণতি অমঙ্গলকর।’

‘নির্বাচনই শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র পথ। এটি যদি ভেঙে যায় তাহলে আমরা মহাবিপদের দিকে ধাবিত হবো। এটি কারো জন্যেই কল্যাণ বয়ে আনবে না। এর মাসুল আমাদের সবাইকে দিতে হবে।’

এই নির্বাচন বিমুখতার দায়ভার কি জনগণকেও নিতে হবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জনগণ তো পরিস্থিতির শিকার। ভিকটিমকে তো আপনি দায়ভার দিতে পারেন না। নির্বাচনী পরিবেশকে সঠিক করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ও সরকারের। যারা এই দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন তাদের।’

মানুষ নির্বাচনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এদেশের মানুষ বিরাট লাইন করে ভোট দিয়ে পৃথিবীতে সুনাম পেয়েছে। নারীরাও দীর্ঘ লাইন ধরে ভোট দিয়েছেন। সেসব দৃশ্য গেলো কোথায়? নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার ফলেই এমন হয়েছে।’

Leave A Reply

Your email address will not be published.