Ultimate magazine theme for WordPress.

বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ প্রবাদ পুরুষ, অমর কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২২তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ…

কথাশিল্পী শওকত ওসমান। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই কথাশিল্পী ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারী পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রগহণ করেন।

তার আসল নাম আজিজুর রহমান, ছদ্মনাম শওকত ওসমান। পিতা শেখ মোহাম্মদ এহিয়া, মাতা গুলজান বেগম। তিনি সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। সবল সিংহপুরেই তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু। ১৯২৯ সালে জুনিয়র মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ হলে আলিয়া মাদ্রাসায় ওল্ডস্কীমে ভর্তি হন। কিন্তু সেটা পরিবর্তন করে এঙলো পার্সিয়ান বিভাগ থেকে ১৯৩৩ সালে এন্ট্রেস পাস করেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন।

১৯৪১ সালে বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। ১৯৩৮ সালের ৬ই মে শওকত ওসমান কলকাতার হাওড়ায় সালেহা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শওকত ওসমানের চাকরি জীবন ছিল বিচিত্র।

প্রথম চাকরি কলকাতার মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ওয়াটার ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট ও পশ্চিমবঙ্গের তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। ১৯৪২ সালে কলকাতার ইনস্টিটিউট অব কমার্সে অধ্যাপনা শুরু করেন।

এখানে তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলেন অরুন কুমার, যিনি প্রখ্যাত অভিনেতা উত্তম কুমার নামে পরিচিত। পরে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি চট্টগ্রামের কমার্স কলেজে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা কলেজে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে এই কলেজ থেকেই অবসর গ্রহন করেন শওকত ওসমান। শওকত ওসমানের প্রথম বই ছোটদের জন্য লেখা ওটেন সাহেবের বাংলো। পরবর্তীতে শওকত ওসমান মোট ৮৬টি বই রচনা করেন। যার মধ্যে জননী ও ক্রীতদাসের হাঁসি ধ্রুপদ সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), পাকিস্থান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, মুক্তধারা পুরস্কার, মাহবুব উল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার, ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার, টেনাসিস পুরস্কার ও স্বাধিনতা দিবস পুরস্কার এ ভূষিত হন।

কথাশিল্পী শওকত ওসমান পাকিস্থান ছাড়াও ইংল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, রাশিয়া, ফ্রান্স, তুরস্ক ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। বর্তমানে শওকত ওসমান রচিত ছোটদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস পঞ্চসঙ্গী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুদান প্রাপ্ত। ছবিটি পরিচালনা করেছেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র, চলচ্চিত্র নির্মাতা জাঁ-নেসার ওসমান।

১৯৭১ সালে কথাশিল্পী শওকত ওসমান পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে স্বক্রিয় অংশগ্রহন করেন। কথাশিল্পী শওকত ওসমান মূলত ছিলেন সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদ বিরোধী। এই প্রবাদ পুরুষ আজীবন শোষকের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে শোষিতের কথা বলেছেন। শওকত ওসমান রচিত ক্রীতদাসের হাঁসি সর্বকালের সকল সৈরশাষকের বিরুদ্ধে গণজাগরনের দিশারী। তাঁর রচিত জননী ইংরেজী ও ঊর্দু ভাষায় অনুদিত হয়ে বিশ্ব সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এই মহান কথাশিল্পী ১৯৯৮ সালের ১৪ই মে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যে এক বিশাল শুন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

আজ ১৪ই মে, বৃহস্পতিবার সেই অমর কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ২২তম মৃত্যু বার্ষিকী। আমরা যারা অমর এ প্রবাদ পুরুষ, অমর কথাশিল্পী শওকত ওসমানের আদর্শিক ভাবনাকে ধারণ করি, তারা যেন আবারো শোষকের বিরদ্ধে গর্জে উঠতে কুন্ঠাবোধ না করি। যেমন ‘ক্রীতদাসের হাসিতে’ তাতারীর আর্তনাদ টাকা-কড়ি দিয়ে গোলামকে ক্রয় করা গেলেও ক্রীতদাসের হাসি কেনা যায় না। তবে এই আর্তনাদকে অনুভব করতে হলে ফিরে যেতে হবে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে, যে আমলে সামান্য বিরোধিতাকেও গলাচেপে কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হতো। আমাদের সমাজেও পারিপার্শিক প্রায় সব অফিস-আদালত এমনকি রাষ্ট্রে একই অবস্থা কারণ অল্পকিছু টাকা পয়সা দিয়েই ওরা, মানে মালিক শ্রেণীর লোকেরা আমাদের কণ্ঠরোধ করতে চায়। অবশ্য আমলারা তাতারির চেয়েও বেশি খারাপ অবস্থায় আছে কেননা যবে থেকে তাঁরা চাকরি নামক দাস হয়ে রাষ্ট্রের জামাই হয়ে গিয়েছেন এবং সেদিন থেকেই তাঁদের হাসিটাও বিক্রি করে দিয়েছেন। তাই একটি চাওয়া- বিক্রিত হাঁসি নয়, শোষকের বিরুদ্ধে আমরা যেন আজীবন লড়াই করে যেতে পারি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.