বাঙালির ইতিহাসের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেছিলেন এই দিনে

পাকিস্তানের কারাগারে ২৯০ দিন বন্দি থাকার পর  ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ভোররাতে মুক্তি পান বাঙালির ইতিহাসের বরপুত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তি পাওয়ার পর সকাল সাড়ে ৬টায় পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে। ৯ তারিখ রওনা দেন দেশের উদ্দেশে, ১০ তারিখ এসে পৌছান দিল্লি,  সেখান থেকে ফিরেন সদ্য-স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে।

বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি লাভ করে এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে বলা হয় অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়।

লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর সময় কাটে যেভাবে : ৮ জানুয়ারি সকাল ৬ টায় লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌছান। সকাল ১০টার পর তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তার সঙ্গে দেখা করেন। একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় বিশ্বের নেতাকে দেখতে হোটেলে চলে আসবেন, এটা অতীতে কখনও ঘটেনি, ভবিষ্যতেও হয়তো ঘটবে না। এটা বঙ্গবন্ধুর জন্য হয়েছে। সে সময়ের বিরোধী দলের নেতা হ্যারল উইলশন ছুটে আসেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। হাউজ অফ কমন্স ও লর্ডসের অনেকে চলে আসেন, বাংলাদেশ তখন স্বীকৃত রাষ্ট্রও নয়৷

লন্ডনে সে সময় ছিলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। লন্ডনের দিনটি বঙ্গবন্ধুর ব্যস্ত কেটেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হোটেলে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলাম।  প্রথমে অবাক হলাম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ হোটেলে চলে এলেন। সেটি স্পষ্টতই ইংল্যান্ডের প্রটোকলের বিচ্যুতি।’

বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রবাসী সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর দলের নেতাকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দেশের খবর নিয়ে লন্ডন থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  লন্ডনে থেকে দেশের পরিস্থিতির কথা শুনেন। অশ্রুসজল হয়ে উঠে তাঁর চোখ, তিনি দেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন।

লন্ডনের প্রবাসী বাংলাদেশিরা বঙ্গবন্ধুর আগমনের কথা শুনে ক্লারিজ হোটেলের বাইরে ভিড় জমান বঙ্গবন্ধুকে এক পলক দেখার জন্য। তখন চতুর্দিকে ছিল কেবল একটাই ধ্বনি- “জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু”।

বিচারপতি মানিক বলেন, ‘মুহূর্তের খবর রটে গেল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এখন লন্ডনে। এ খবর পাওয়ার পরে অন্যান্য শহর থেকে লোকজন এসে জমা হতে থাকলো। এমন পরিস্থিতিতে যে, রাস্তা বন্ধ হয়ে এলো, পুলিশও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। চারদিকে স্লোগান জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।  সকলের চোখে আনন্দাশ্রু। বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছেন এই আনন্দে। আর বঙ্গবন্ধু হোটেল কক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে জানালায় দেখা দেন। একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলনও করলেন। কি অবস্থায় আছে তাঁর দেশ, তিনি ততক্ষণে জানতে পেরেছেন।

৯ তারিখে দেশের পথে রওয়ানা :  ৯ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৯ জানুয়ারি সানডে টাইমস “ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের বৈঠক” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। ৯ জানুয়ারি লন্ডন ছাড়ার পর বিবিসি ঘোষণা দেয়, “বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন”।

১০ তারিখ সকালে এসে পৌঁছান দিল্লি। সেখানে তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র মন্ত্রিসভা, নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সেদেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন। তখন দেশে চলছে বঙ্গবন্ধুকে বরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

১০ জানুয়ারি  বিকেলে বাংলার মাটিতে পা রাখেন বাংলাদেশের স্থপতি। বিকেলে ৫টায় তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে পৌঁছান তিনি। সমগ্র ময়দানে জনসমাগমে কানায় কানায় পূর্ণ। এর আগেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য গাজী গোলাম মোস্তফার বরাত দিয়ে দৈনিক বাংলার ১০ জানুয়ারির খবর বলছে, বিমানবন্দর থেকে বঙ্গবন্ধু সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নেতা আসছেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু আসছেন, সবাই সেই প্রহর গুনছেন। রিকশাচালক থেকে পত্রিকার হকার, কারখানার শ্রমিক কিংবা দোকানদার, অফিস আদালতের কর্মচারী, ছাত্র-ছাত্রী, বাড়ির গৃহিণী সবাই উম্মুখ হয়ে রয়েছেন।

পরিবারের অপেক্ষা : দেশবাসীর মতো পরিবারের সদস্যরাও অধীর আগ্রহে বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায় ছিলেন। দৈনিক বাংলায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তিনি এসেই বেগম মুজিবকে উদ্ধার করবেন। বেগম মুজিব স্বামী না আসা পর্যন্ত অন্তরীণকালীন ঘাঁটিটি ছেড়ে বের হননি। বঙ্গবন্ধু এলে সেই বাসা থেকে ৩২ এর বাসায় যাবেন তিনি।

১৯৭২-এর জানুয়ারির এই সময়টি নেতা মুক্ত হওয়ার পরে দেশে না ফেরা পর্যন্ত সব আয়োজনই ছিল তাকে ঘিরে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তাঁর ঐতিহাসিক  বক্তৃতায় জাতির পিতা সেদিন বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এতো ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এতো ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এতো ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ সশ্রদ্ধ চিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন।

Loading...