Ultimate magazine theme for WordPress.

ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড

শেখ হাসিনা | ১৫ আগষ্ট ২০২০

জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু। ছবি: বাল কৃষ্ণান, বঙ্গবন্ধু: এপিটমি অব আ নেশন

জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু। ছবি: বাল কৃষ্ণান, বঙ্গবন্ধু: এপিটমি অব আ নেশন

 

আল্লাহু আকবার…
হা ইয়া আলাস সালা
হা ইয়া আলাল ফালা…
নামাজের জন্য এসো
কল্যাণের জন্য এসো…

মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। প্রত্যেক মুসলমানকে আহ্বান জানাচ্ছে…
সে আহ্বান উপেক্ষা করে ঘাতকেরা এগিয়ে এল ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য। গর্জে উঠল ওদের হাতের অস্ত্র। ঘাতকের দল হত্যা করল স্বাধীনতার প্রাণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এই নরপিশাচেরা হত্যা করল আমার মাতা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে। হত্যা করল মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রনেতা শেখ কামালকে, শেখ জামালকে, তাদের নবপরিণীতা বধূ সুলতানা কামালকে ও রোজী জামালকে। তাদের হাতের মেহেদির রং বুকের তাজা রক্তে মিশে একাকার হয়ে গেল। খুনিরা হত্যা করল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভ্রাতা শেখ আবু নাসেরকে। সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কর্নেল জামিলকে, যিনি নিরাপত্তাদানের জন্য ছুটে এসেছিলেন। হত্যা করল কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার ও কর্মকর্তাদের। আর সর্বশেষে হত্যা করল শেখ রাসেলকে, যার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। বারবার রাসেল কাঁদছিল ‘মার কাছে যাব’ বলে। তাকে বাবা ও ভাইদের লাশ কাটিয়ে মায়ের লাশের পাশে এনে হত্যা করল ওরা। ওদের ভাষায়, রাসেলকে মার্সি মার্ডার (দয়া করে হত্যা) করা হয়েছে।

ওই ঘৃণ্য খুনিরা যে এখানেই হত্যাকাণ্ড শেষ করেছে, তা নয়। একই সঙ্গে একই সময়ে হত্যা করেছে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনিকে ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। হত্যা করেছে কৃষকনেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে, তাঁর ১৩ বছরের কন্যা বেবীকে। রাসেলের খেলার সাথি তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র ১০ বছরের আরিফকে। জ্যেষ্ঠ পুত্র আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ সন্তান চার বছরের সুকান্তকে, তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবাত, নান্টুসহ পরিচারিকা ও আশ্রিত কয়েকজনকে।

আবারও একবার বাংলার মাটিতে রচিত হলো বেইমানির ইতিহাস। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে বেইমানি করেছিল তাঁরই সেনাপতি মীর জাফর ক্ষমতার লোভে, নবাব হওয়ার আশায়।

১৯৭৫ সালে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল বাংলাদেশে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল তাঁরই মন্ত্রিপরিষদ সদস্য খন্দকার মোশতাক, রাষ্ট্রপতি হওয়ার খায়েশে। ঘাতকের দলে ছিল কর্নেল রশিদ, কর্নেল ফারুক, মেজর ডালিম, হুদা, শাহরিয়ার, মহিউদ্দিন, খায়রুজ্জামান, মোসলেম গং। পলাশীর প্রান্তরে যেমন নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল নবাবের সৈন্যরা সেনাপতির গোপন ইশারায়, ১৯৭৫ সালের এ দিনটিতেও নীরব ছিল তারা, যারা বঙ্গবন্ধুর একান্ত কাছের, যাদের নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন, বিশ্বাস করে ক্ষমতা দিয়েছিলেন, যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল। এতটুকু সক্রিয়তা বা ইচ্ছা অথবা নির্দেশ বাঁচাতে পারত বঙ্গবন্ধুকে। খন্দকার মোশতাকের গোপন ইশারায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল তারা, এগিয়ে এল না সাহায্য করতে। মীর জাফরের নবাবি কত দিন ছিল? তিন মাসও পুরো করতে পারেনি খন্দকার মোশতাকের রাষ্ট্রপতি পদও (যা সংবিধানের সব নীতিমালা লঙ্ঘন করে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অর্জিত) ।

আসলে বেইমানদের কেউই বিশ্বাস করে না। এমনকি যাদের প্ররোচনায় এরা ঘটনা ঘটায়, যাদের সুতোর টানে এরা নাচে, তারাও শেষ অবধি বিশ্বাস করে না। ইতিহাস সেই শিক্ষাই দেয়, কিন্তু মানুষ কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়?

যুগে যুগে এ ধরনের বেইমান জন্ম নেয়, যাদের ক্ষমতালিপ্সা একেকটা জাতিকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়, ধ্বংস ডেকে আনে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই খুনিরা হত্যা করেছে। বাঙালি জাতির চরম সর্বনাশ করেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসে খুনিদের আইনের শাসনের হাত থেকে রেহাই দিয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করে পুরস্কৃত করেছে। আইনের শাসনকে আপন গতিতে চলতে দেয়নি। বরং অন্যায়-অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে—যার অশুভ ফল আজ দেশের প্রত্যেক মানুষকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগাচ্ছে।

এই খুনিদের বাংলার মানুষ ঘৃণা করে।
বঙ্গবন্ধুকে এরা কেন হত্যা করেছে?
কী অপরাধ ছিল তাঁর?
স্বাধীনতা—বড় প্রিয় একটি শব্দ, যা মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষা। পরাধীনতার নাগপাশে জর্জরিত থেকে কে মরতে চায়?

একদিন পাকিস্তান কায়েমের জন্য সবাই লড়েছিল। লড়েছিলেন বঙ্গবন্ধুও। কিন্তু পাকিস্তানের জন্মলাভের পর বাঙালি কী পেল? না রাজনৈতিক স্বাধীনতা, না অর্থনৈতিক মুক্তি। বাঙালির ভাগ্যে কিছুই জুটল না। জুটল শোষণ-বঞ্চনা–নির্যাতন। মায়ের ভাষা-মুখের ভাষাও পাকিস্তানি শাসকেরা কেড়ে নিতে চাইল। বুকের রক্ত দিয়ে বাঙালি তার মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করল। বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস করে দেওয়ার নানা ষড়যন্ত্র চলতে থাকল।
দেশের সম্পদ পাচার করে বাঙালিকে নিঃস্ব করে দিয়ে ২২টি পরিবার সৃষ্টি করে শোষণ অব্যাহত রাখল। আর বঙ্গবন্ধু মুজিব শোনালেন অমর বাণী—স্বাধীনতা। দেখালেন মুক্তির পথ।
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা…।’
ঘোষণা করলেন বাঙালির বিজয়।
জয় বাংলা
সে–ই তো তাঁর অপরাধ।

যে বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের লীলাক্ষেত্র, জানোয়ারের মুখ থেকে শিকার কেড়ে নিলে যেমন সে হিংস্র হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনই হিংস্র হয়ে উঠল পরাজিত শত্রুরা। কারণ, ওই অমর বাণী ধ্বনি–প্রতিধ্বনি হয়ে বেজে উঠল সমগ্র বাঙালির শিরায়-উপশিরায়, প্রচণ্ডরূপে আঘাত হানল বাঙালির চেতনায়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠের অমর সেই বাণী যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করল প্রত্যেক বাঙালিকে। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুকে পরাজিত করে বাংলার দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে আনল স্বাধীনতার লাল সূর্য।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ওই পরাজিত শত্রুদের দোসর নিজেদের জিঘাংসা চরিতার্থ করল যেন। পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করল। মুজিববিহীন বাংলাদেশের আজ কী অবস্থা? বঙ্গবন্ধু মুজিবের সারা জীবনের সাধনা ছিল শোষণহীন সমাজ গঠন। ধনী-দরিদ্রের কোনো ব্যবধান থাকবে না। প্রত্যেক মানুষের জীবনে ন্যূনতম প্রয়োজন—আহার, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের সুযোগ। সারা বিশ্বে বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্তাকে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে তিনি চেয়েছিলেন। আর সেই লক্ষ্যে সারা জীবন ত্যাগ করেছেন, আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন, জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। ফাঁসির দড়িও তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে একচুল নড়াতে পারেনি। তাঁর এই আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য আদর্শস্থানীয়।
কিন্তু আমরা কী দেখি? বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ঘাতকেরা ক্ষান্ত হয়নি, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পর্যন্ত বিকৃত করে ফেলছে। বঙ্গবন্ধুর অবদান খাটো করা হচ্ছে। ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য চক্রান্ত চলছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মূল্যবোধ, আদর্শ-উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দেওয়া হলো। যে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ স্বাধীন করে গণতন্ত্র কায়েম করেছিল বাঙালিরা, সেই গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সামরিক জান্তার শাসন কায়েম করল হত্যাকারীরা। সাধারণ মানুষ তার মৌলিক অধিকার হারাল। ভোট ও তাদের অধিকার বন্দী হলো সেনাছাউনিতে। এদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠল ক্ষুদ্র লুটেরা গোষ্ঠী, অবাধ লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হলো। এদের দুঃশাসনেই প্রশ্রয় পেল দুর্নীতি ও চোরাচালান। সামাজিক ন্যায়নীতি, মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে এখন শাসকগোষ্ঠী ভোগবিলাসী ও মাদকাসক্ত উচ্চশ্রেণি সৃষ্টি করে অবাধে শোষণ চালাচ্ছে।

বৃহৎ জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বঙ্গবন্ধুর আমলে যে শিক্ষিতের হার ছিল ২৬ শতাংশ, তা এখন দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে, ভূমিহীনদের সংখ্যা ছিল ৩৭ শতাংশ, এখন তা প্রায় ৭০ শতাংশ। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকদের খাজনা দিতে হতো না, বর্তমানে খাজনা ও করের বোঝা অতিরিক্ত। ২২ পরিবারের পরিবর্তে জন্ম নিয়েছে কয়েক শ পরিবার, যারা অবাধ লুটপাটের লীলাক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আমলে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ ভাগ, এখন তা দাঁড়িয়েছে ২ ভাগের নিচে, আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি পণ্যে দেশ ছেয়ে গেছে, দেশি পণ্য বাজারে বিকোচ্ছে না; অবাধ চোরাচালানের ফলেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আমলে মদ, জুয়া, রেস ছিল নিষিদ্ধ। বর্তমানে ঘরে ঘরে মিনি বার বসেছে, বাজারে তো কথাই নেই। গ্রামপর্যায়ে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মাদক চোরাচালানের সুগম পথ আজ বাংলাদেশ, যার বিষাক্ত প্রক্রিয়া সমাজে অশুভ প্রভাব ফেলে কত তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আজ চরম অবনতি ঘটেছে। বেকার সমস্যা দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত যুবকেরা চাকরির অভাবে হতাশাগ্রস্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্ত্রবাজির মাধ্যমে ধ্বংস করা হচ্ছে। সরকারি মদদে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। বাজেটের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সব থেকে কম বরাদ্দ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবন দিশেহারা। অনাহার-অপুষ্টিতে হাজার হাজার মানুষ ভুগছে। শিশুরা বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে, অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই তো বর্তমান বাংলাদেশের চেহারা। স্বাধীনতার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে শুধু একটি মানুষের অভাবে। বাংলার মানুষের এই দুর্ভোগের জন্য দায়ী ওই খুনিরা, দায়ী ষড়যন্ত্রকারীরা।

তাই এই হত্যাকাণ্ডের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের উৎখাত করতে হবে। সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান না ঘটলে বাংলার মানুষের মুক্তি আসবে না। গণতন্ত্রই মুক্তির একমাত্র পথ।
আজ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবসে প্রত্যেক বাঙালিকে শপথ নিতে হবে, বাংলার মাটি থেকে সামরিক শাসনের অবসান ঘটাব। জনতার আদালতে খুনিদের বিচার করব। ষড়যন্ত্রকারীদের মূলোৎপাটন করে বাংলার মানুষকে বাঁচাব।

ভোরের কাগজ, ১৫ আগস্ট ১৯৯৪

Leave A Reply

Your email address will not be published.