প্রবাসীদের টিকা দিতে অনীহা কেন

দূর পরবাস ডেস্ক

করোনা মহামারির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত ৬ মার্চ বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরপর করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকায় ফ্লাইট আর চালু হয়নি।

গত বছরের ১ আগস্ট সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত নিলেও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ মোট ৩৪ দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে কুয়েত। করোনায় দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ৩৪ দেশের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালু না হওয়ায় আকামার মেয়াদ থাকলে নিষিদ্ধ দেশের নাগরিকদের ৩৪ দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ হয়ে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থেকে পিসিআর সনদ নিয়ে কুয়েতে প্রবেশ করতে কোনো বাধা ছিল না।

আর এতেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সুযোগ ভিজিট ভিসায় দুবাই হয়ে কুয়েতে আসা। কিন্তু অন্য দেশের নাগরিকেরা এক লাখ টাকার মধ্যে দুবাই হয়ে কুয়েতে প্রবেশ করলেও বাংলাদেশিদের খরচ ছিল দুই থেকে তিন লাখ টাকা। ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে শুধু তাঁরাই আসছেন, যাঁদের খুব বেশি জরুরি।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন করোনার প্রকোপ আবার বেড়ে যায়, তখন ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পুনরায় বিদেশিদের কুয়েত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর মধ্যে অনেক দিন ফ্লাইট চালু না হওয়ায় যাঁদের আকামা শেষ, তাঁরা কুয়েতে আর প্রবেশ করতে পারেননি। যাঁরা দুবাই হয়ে আসতে চাচ্ছেন, হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুবাইতে আটকা পড়ে গেছেন অনেক প্রবাসী।

ছুটিতে বা করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে দেশে গিয়ে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীরা আবার কবে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আর কাটছেই না। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফ্লাইট চালু হলেও কুয়েতের সঙ্গে যেন নয়ছয় খেলা খেলছে। বারবার চালু হওয়ার কথা থাকলেও চালু হয় না। যাঁদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাঁরা তো নিশ্চিত হয়ে গেছেন কুয়েতে প্রবেশ করতে পারবেন না, কিন্তু যাঁদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ এখনো আছে, তাঁদের প্রবেশের ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এর মধ্যে কুয়েত সরকার ঘোষণা করে, ট্রানজিটে যাঁরা আছেন, তাঁদের কুয়েতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। শুধু যাঁরা কুয়েতে অনুমোদিত পাঁচটি টিকার (অক্সফোর্ড, ফাইজার, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না ও জনসন) যেকোনো একটি গ্রহণ করেছেন। তবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর যাত্রীদের অনুমতি দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশে কুয়েত অনুমোদিত টিকা এত দিন না থাকায় প্রবাসীরা ফিরতে পারেননি। ৩০ মে কাতার এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে দেশে পৌঁছেছে ফাইজার-বায়োএনটেকের ১ লাখ ৬২০ ডোজ টিকা। বাংলাদেশে ফাইজার ও সিনোফার্মের টিকা প্রথম ডোজ হিসেবে একসঙ্গে দেওয়া শুরু হয়েছে।

আগে নিবন্ধনকারী যাঁরা এখনো কোনো কোম্পানির টিকা পাননি, তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই টিকা দেওয়া হবে।
যেহেতু ‘ফাইজার’ প্রবাসীদের জন্য কুয়েত অনুমোদিত টিকা, এ ছাড়া অন্য কোনো টিকা দেশে চলমান নেই, সেহেতু কুয়েতপ্রবাসীদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এ টিকা প্রদান করা জরুরি। কিন্তু প্রবাসীরা বারবার দূতাবাসের কাছে আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেনি। সর্বশেষ ১৫ জুন প্রবাসীরা মানববন্ধন, সমাবেশ করেছেন জাতীয় প্রেসক্লাবে।

ছুটিতে থাকা কুয়েতপ্রবাসীরা বলেন, ‘আমরা যারা টিকার জন্য কুয়েতে যেতে পারছি না, তাদের জন্য ইউনিয়নভিত্তিক ভাগ করে, আইডি কার্ড না থাকলেও পাসপোর্ট অনুযায়ী টিকা দিতে সরকারকে অনুরোধ করছি। এতে আমাদের পরিবার ও নিজের খুব উপকার হবে।’

তাঁরা আরও বলেন, ‘করোনায় দেশে আটকে পড়া কুয়েতপ্রবাসীরা খুব দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এবং চলার পথে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আকামা শেষ হয়ে গেলে আর ফেরা সম্ভব হবে না।

এ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে কুয়েত সরকার অনুমোদিত ফাইজার ভ্যাকসিন প্রদান করে আমাদের কুয়েতে ফিরতে প্রস্তুত রাখা হোক। কুয়েতের ফ্লাইট চালু হওয়ামাত্রই আমরা যাতে আবার আমাদের কর্মস্থলে ফিরতে পারি।’

‘কুয়েতে প্রবাসী’ গ্রুপের অ্যাডমিনরা বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ দূতাবাসে আবেদন জানিয়েছিলাম। তবে তাতে কোনো ফল পাব বলে মনে হচ্ছে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের প্রবাসী ভাইদের ফাইজারের টিকা দেওয়া হোক। এসব প্রবাসীরা ফিরতে না পারলে অনেক বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অন্যদিকে রেমিট্যান্সেও ধস নামবে।’

রেমিট্যান্স-যোদ্ধারা দেশের সম্পদ। দেশকে এগিয়ে নিতে তাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ছুটিতে থাকা প্রায় ১০ হাজার কুয়েতপ্রবাসী দেশে আটকে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁদের দেখার যেন কেউ নেই। দ্রুত ফাইজারের টিকা প্রদান করে এসব প্রবাসীকে কুয়েতে ফিরতে সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব।

Loading...