পলিথিন পুড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ, প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান শিল্পী

বাল্যকাল থেকেই ছবি আঁকা, কবিতা ও গান লিখতে ভালবাসতেন এমিলিয়া রায়। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় লেখাপড়া থেমে গেলেও থেমে যায়নি তার ইচ্ছা শক্তি। স্বামীর সংসারে এসে নিজের অদম্য ইচ্ছায় আবারও শুরু করেন ছবি আঁকা, কবিতা ও গান লেখা।

নানাগুনের অধিকারী এমিলিয়া রায় নিজের কল্পনা আর ইচ্ছা শক্তির জোরে স্বল্প খরচে সৃষ্টিশীল কিছু করার চেষ্টা করেন। আর তাই তিনি বেঁছে নিয়েছেন পরিবারের ফেলে দেয়া অপ্রয়োজনীয় পলিথিন। বিভিন্নজনের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করে রান্নার চুলোয় গলিয়ে শুরু করেন ভাস্কর্য তৈরির কাজ। ধীরে ধীরে তিনি তৈরি করেন স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর্তমানবতার সেবক মহীয়সী নারী মাদার তেঁরেসা।

এমনই একজন গুণী শিল্পীর দেখা মিলেছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের রাহুৎপাড়া গ্রামের এমিলিয়া রায়। প্রচার বিমুখ এই গুণী শিল্পী জঞ্জাল মুক্ত পরিবেশ দুষণকারী পরিত্যাক্ত পলিথিন দিয়ে তৈরী করেছেন সহস্রাধিক ভাস্কর্য। ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করা শিল্পী এমিলিয়া রায়ের শেষ ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তার পরম যত্মে নির্মাণ করা ভাস্কর্যগুলো নিজ হাতে তুলে দেয়া।

জানা গেছে, ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা, কবিতা লেখা, গান গাওয়া ও নিজের লেখা গানে কন্ঠ দেয়ার প্রতি প্রচন্ড ঝোঁক ছিল এমিলিয়ার। এসএসসি পাস করার পরেই বিয়ে হয় আলফ্রেড রায়ের সঙ্গে।  সংসার জীবনে ঢুকে লেখাপড়া থেমে গেলেও থেমে যায়নি তার উদ্ভাবনী ইচ্ছা শক্তি। বিয়ের পরে স্বামীর সংসারেও নতুন করে এমিলি শুরু করেন ছাত্রজীবনে তার সেই উদ্ভাবনীর বহিঃপ্রকাশ। দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জননী এমিলিয়া রায়। স্বামী মারা যাবার পরে স্বাবলম্বী হওয়া ছেলে মেয়েদেরও দেখ ভাল’র সকল দ্বায়িত্ব নিয়েছেন প্রায় সত্তোর ছুঁই ছুঁই করা এমিলিয়া নিজেই।

১৯৯০ সালের কোন একদিন রান্না করা গরম কড়াই পাশের পলিথিন ব্যাগের ওপর রাখায় পলিথিন ব্যাগ গলতে দেখে ওই পলিথিনের মাধ্যমেই নতুন করে উদ্ভাবনীর নতুন ইচ্ছে কড়া নাড়ে তার মনে। সেদিন থেকে পরিবারের ফেলে দেওয়া পলিথিন ব্যাগ বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে সংগ্রহ করে তা আগুনে পুড়িয়ে শুরু করেন ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। নির্মাণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভাস্কর্য, প্রায় ৮০কেজি ওজনের মাদার তেঁরেসার ভাস্কর্য। শিল্প দক্ষতা আর নিপুন ছোয়ায় পর্যাক্রমে তৈরি করেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর ভাস্কর্য।

নিজের রাজনৈতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নির্মাণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাস্কর্য। ’৭৫ এর ১৫আগস্ট জাতির পিতার সাথে ঘাতকের বুলেটের সামনে দাড়িয়ে প্রাণপন বাঁচার আকুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শেখ রাসেলের ভাস্কর্য। নির্মাণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে নির্যাতনের এতিহাসিক ভাস্কর্য। ছোট বড় মিলে অন্তত শতাধিক ভাস্কর্য রয়েছে তার নিজের সংগ্রহ শালায়।

বর্তমানে বার্ধক্যজনিত কারণে শারীরিক অসুস্থতায় তেমন হাঁটা চলায় সমস্যা হলেও থেমে নেই তার শিল্পকর্ম নির্মাণের কাজ। নিরলসভাবে নির্মাণ করে চলেছেন ভাস্কর্য।

শুধু পরিবেশ বিরুপ পলিথিন দিয়ে ভাস্কর্য নির্মানই নয়; গুনী শিল্পী এমিলিয়া তুলা দিয়ে আঁকা ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিভিষীকাময় দৃশ্যগুলো। এছারাও মানুষের চুল সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর মুখ মন্ডল সম্বলিত অপরুপ বাংলাদেশের মানচিত্র।

শিল্পী এমিলিয়া রায় জানান, শেষ জীবনে তার ইচ্ছা; নিজের হাতে তৈরি করা ভাস্কর্যগুলো মমতাময়ী মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু সকল ভাস্কর্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ঘাতকের বুলেটে নির্মম হত্যার শিকার হওয়ার আগে শেখ রাসেলের বাঁচার আকুতিভরা নিপুন ভাস্কর্যটি নিজের কাছেই রাখতে চান তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার তিন বছরের ছেলে তিনু রায় অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের অভাবে বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে ধুকে ধুকে মারা যায়। শেখ রাসেলের আকুতিভরা ভাস্কর্যর মধ্যে তিনি খুঁজে পেতে চান নিজের হারানো ছেলে তিনুকে।

Loading...