পরীমণি’র মুক্তিতে সুপারস্টার শাকিব খান একটা সাবজেক্ট

বি. হৃদয়, ঢাকা:

সুপারস্টার আসলে সুপারস্টারই। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে নজির রয়েছে যে, একটি আলোচিত বিষয়ে যখন কোনো সুপারস্টার ব্যাক্তি বা বিষয়ের পক্ষে কথা বলেন, পুরো দেশ বা জাতি সে পক্ষে চলে আসে। তারই প্রমান আলোচিত নায়িকা পরীমণির মুক্তি।

৪ আগস্ট পরীমনির বাসায় অভিযান পরিচালনা করে রেব বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, মদের বোতলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য জব্দ করে তাকে ধরে নিয়ে যায় রেব। এরপর ৫ আগস্ট চার দিন এবং ১০ আগস্ট দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের পর ১৩ আগস্ট পরীমণিকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।

 

 

এর আগে৭ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরীমণির সদস্যপদ স্থগিত করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি।

পরীমণিকে আটকের শুরুর থেকে শিল্পীদের তেমন কাউকেই পরীর পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়নি। শুধু সাংবাদিকদেরকে গঠন মূলক প্রতিবেদন লিখতে দেখা গেছে। দু একজন তারকা নীতিকথা বললেও তা সামাজিক মাধ্যমে চোখে পরেনি। তবে এ সময় জোড়ালো ভুমিকা রখেছেন সুপারস্টার শাকিব খান। ১৪ আগস্ট মহা এই নায়ক ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাস দেন।

সেখানে শাকিব খান বলেছেন, খেয়াল করছিলাম, অপেক্ষাও করছিলাম। প্রত্যাশা ছিলো পরীকে ছেড়ে দেওয়া হবে, বিপরীতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিলো।

 

সহকর্মী হিসেবে যতদূর জানি পরীমণি বাবা-মা হীন। তার বেড়ে ওঠা পারিবারিকভাবে আর পাঁচটা তরুণ-তরুণীর বেড়ে ওঠা, স্ট্রাগলে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। হয়তো সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে পরীমণি অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

 

 

১০ আগস্ট আদালত চত্বরে পরীমণির শতবর্ষী নানা তার নাতনিকে দেখতে ছুটে গিয়েছিলেন। করোনার এই ভয়াবহতাও আটকাতে পারেনি তার বৃদ্ধ নানাকে। রক্তকে উপেক্ষা করতে পারেনি রক্ত। কিন্তু সময় কি নিষ্ঠুর! পরীমণির সঙ্গে নাকি দেখাই হলো না বৃদ্ধ নানার। আদালত চত্বরেই পরীমণির নানাকে বলতে শুনেছি, পরীমণি নিজের জন্য জীবনে কিছুই করেনি। সব মানুষের জন্য দান করে গেছে। আর এখন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।

 

পরীমণির মামলা এখন বিচারাধীন। ওই বিষয়ে কিছু বলছি না। সে যে মামলায় গ্রেফতার হয়েছে, তার কী অপরাধ সেটা বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। দেশের প্রচলিত আইন আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। নিশ্চয়ই নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে সঠিক বিচার হবে। কিন্তু তার আগে পরীমণির জীবন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেভাবে তাকে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে, এটা সত্যি দুঃখজনক।

 

 

সহশিল্পী হিসেবে আশা রাখি, পরীমণির ক্ষেত্রে আইন তার স্বকীয়তা বজায় রাখবে। পরীমণি যখন ফিরবে তার ভুল থেকে শিক্ষাও নেবে। যে শিক্ষা তার আগামী জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।’

শাকিব খানের আবেগঘন ও গঠনমূলক স্ট্যাটাসে শিল্পী সমাজ ও ভক্তদের টনক নড়ে। জনপ্রিয নায়ককের কথায় পরীর পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়া সরব হয়ে ওঠে। রাস্তায় নেমে পরে সংস্কৃতি লালন করে এমন লোকজন। এতোদিন যারা মুখে কুলুপ দিয়ে বসে ছিল তারাও তারাও নানা ভাবে প্রতিবাদ করে। পরীর পক্ষ নেয় বেশ কয়েকজন। তারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে পরীমনির জামিন করেন। সুপারস্টার শাকিব খানের এমন উদ্যোগে ভক্ত ও চলচ্চিত্র বোদ্ধারা প্রশংসা করেছেন। একজন সিনিয়র পরিচালক বলেছেন ‘সুপারস্টার আসলে সুপারস্টার।

 

পরীমণির মুক্তি ‘শাকিব খান একটা সাবজেক্ট’ ছিল

শুধু পরীমনির ক্ষেত্রেই নয়, সিনেমার নানা সমস্যায় শাকিব খান হাল ধরেছেন। চলচ্চিত্রর খারাপ সময়ে নিজে সিনেমায় অর্থলগ্নি করেছেন। এই করোনায় অসচ্ছল শিল্পী ও কলাকুশলীদের মাঝে নিরবে দান করেছেন।

শুধু তাই নয়, শাকিব খান জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতি ভালো হলে ইন্ডাস্ট্রির সবার কথা ভেবে, চলচ্চিত্রের ভালোর কথা ভেবে আবার যৌথ প্রযোজনায় নাববেন।

 

 

এ মাসেই নামী শাকিব খান সরকারী অনুদান পাওয়া ‘গলুই’ শিরোনামের একটি সিনেমার শুটিং শুরু করবেন। যেটি পরিচালনা করবেন হৃদয়ের কথা, আরও ভালোবাসবো তোমায় খ্যাত পরিচালক এস এ হক অলিক। সিনেমায় শাকিব খানের নায়িকা হওয়ার কথা রয়েছে পূজা চেরির।

পরীমণি

ইতোমধ্যে ‘গলুই’-এর জন্য শাহ আলম সরকারের লেখা ও ইমন সাহার সুরে কুমার বিশ্বজিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।

 

শাকিব খানের ছবি মানেই সুপার হিট। প্রযোজকদের নির্ভরতার প্রতিক। তার কথায়, আচরণে এসেছে পরিবর্তন। দেশে নয়, বিদেশে রয়েছে তার সিনেমার কদর। ঢালিউড চলচ্চিত্র একযুগ শাসন করা নায়কে সুপারস্টার বলতেই হয়।

 

সুপারস্টার শাকিব খানের জন্ম ১৯৭৯ সালে। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদীতে। বাবা-মায়ের দেয়া নাম ছিল মাসুদ রানা। বাবা সরকারি কর্মচারী হওয়ায় চাকরির সুবাদে তার শৈশব কৈশোর থেকে বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জ জেলায়। আজকের সুপারস্টারের শৈশবের স্বপ্নের গল্পটাও ছিল আপনার আমার মতোই খুব সাধারণ। আট-দশ জনের মতোই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ার ইচ্ছে থাকলেও শেষমেষ হয়ে গেলেন অভিনেতা।

 

‘অনন্ত ভালোবাসা’ সিনেমা দেখে কী কখনো মনে হয়েছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একদিন রাজত্ব করবে সেই হ্যাংলা-পাতলা ছেলেটি! এখন বাংলাদেশের সিনেমা মানেই শাকিব খান।

 

 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক চেটিয়া রাজত্ব করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে সাফল্য ও দর্শকপ্রিয়তার বিচারে শাকিব খানের ধারে-কাছেও কোনো নায়ককে পাওয়া দুস্কর। তবে একজন সাধারণ মাসুদ রানা থেকে সুপারস্টার শাকিব খান হয়ে ওঠার পথটা সহজ ছিল না। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ শাকিব রাজত্ব করছেন এই চলচ্চিত্র অঙ্গনে। ব্যক্তিগত জীবনে শাকিব খান এক পুত্রের জনক। তবে ভেঙে গেছে তার দাম্পত্য জীবন। ২০১৯ সালের বছরের মার্চ মাসে স্ত্রী চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসকে ডিভোর্স দিয়েছেন তিনি।

 

শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। পরিচালক আফতাব খান টুলুর হাত ধরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেও শাকিব খান অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত অনন্ত ভালবাসা। অনন্ত ভালোবাসা খুব একটা সফল না হলেও নায়ক হিসেবে শাকিব সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অভিনয় জীবনের দ্বিতীয় বছরেই সে সময়ের শীর্ষ অভিনেত্রী শাবনূরের বিপরীতে গোলাম সিনেমায় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একে একে দুজন দুজনার, বিষে ভরা নাগিন, শিকারী, স্বপ্নের বাসর, মায়ের জেহাদ, রাঙ্গা মাস্তান, হিংসার পতন, বন্ধু যখন শত্রুর মতোন জনপ্রিয় সিনেমা।

 

 

আরো পড়ুন:   পরীমনি কান্ডে পুলিশসহ যেসব কোটিপতিরা ধরা, তাদের নাম প্রকাশ হচ্ছে (ভিডিও,নিউজ)

 

তবে এর মাঝে দেখেছেন ব্যর্থতার রুপ ও। তবু থেমে থাকেনি তার পথ চলা। চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যুর পর চলচ্চিত্র যখন থমকে যাওয়ার উপক্রম, সেখানেই হুট করে জ্বলে উঠেন শাকিব। জ্বলছেন আজও। আজ ঢাকা তো কাল ভারত, মালয়েশিয়া, স্কটল্যান্ড, লন্ডন হয়ে অস্ট্রেলিয়া। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী পথচলা অভিযাত্রী শাকিব খানের।

 

তবে ২০১৬ সালে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা শিকারি দিয়ে পর্দায় এক নতুন শাকিব খানের দেখা মেলে। চারদিকে সাড়া ফেলে তার সেই নতুন রূপ। বাংলাদেশের পাশাপাশি শাকিব ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও হয়ে উঠেন আলোচিত। বলা যায় তারকা শাকিবের নবজন্ম ছিল সেই বছর। এরপর নবাব, শিকারী, সত্ত্বা এবং বীর সিনেমা দিয়েও হইচই ফেলে দেন শাকিব।

 

 

২২ বছরের কর্মজীবনে শাকিবের ঝুলিতে এসেছে একাধিক পুরস্কার। যার মধ্যে রয়েছে চারটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, আটটি মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, তিনটি বাচসাস পুরস্কার ও চারটি সিজেএফবি পারফরম্যান্স পুরস্কার।

 

ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না, খোদার পরে মা, আরো ভালোবাসবো তোমায় এবং সত্তা সিনেমার জন্য চারবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

 

 

সুভা, আমার প্রাণের স্বামী, প্রিয়া আমার প্রিয়া, ও বলবো কথা বাসর ঘরে, আদরের জামাই, ডন নাম্বার ওয়ান, পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী, রাজনীতি, চালবাজ, ভাইজান এলো রে, নাকাব ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য সিনেমা।

 

 

আরো পড়ুন:  করোনা টিকা নেওয়ার বয়সসীমা ১৮ হচ্ছে

 

 

তবে শুধু সিনেমাতে অভিনয়ই নয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা, মঞ্চ পরিবেশনা ,বিজ্ঞাপনেও রয়েছে তার বিচরণ। এছাড়াও ২০১১ সালে মনের জ্বালা চলচ্চিত্রে প্রথমবারে মতো তিনি নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে গানে কন্ঠ দেন।

 

 

সাফল্য শাকিবকে এত উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে, ভক্তরা নামে নয়, ‘সুপারস্টার’, ‘কিং খান’, ‘ঢালিউড কিং’ এইসব বিশেষণে ডাকতেই বেশি আনন্দ পান। তবে সেই সাধারণ মাসুদ রানা থেকে আজকের এই সুপারস্টার শাকিব হতে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক চড়াই-উতরাই। ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম, আর স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখার জন্য ব্যর্থতার পরও কাজ করে যাওয়া এই মন্ত্রেই তিনি হয়ে উঠেছেন আজকের সুপারস্টার।

 

edited by: sa srk

Leave A Reply

Your email address will not be published.