পদোন্নতি, গাড়ি ও মামলা জট নিয়ে পুলিশের ক্ষোভ

দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের পদোন্নতি না হওয়া, পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকা, মামলার জট বৃদ্ধি ও সাংগঠনিক কাঠামো ও অপারেশনাল কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামালের সঙ্গে বৈঠকে এসব ব্যাপারে ক্ষোভ ও অসন্তষ্টি প্রকাশ করেন উর্ধ্বোতন পুলিশ কর্মকর্তারা।

সভায় র‌্যাব ডিজি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ হচ্ছে বেস্ট ল অ্যান্ড এজেন্সি ইন কান্ট্রি। যা বলবেন তাই করবে। কিন্তু পুলিশের ফোর্স গাড়ি কম। এডিশনাল এসপি হচ্ছে অপারেশনাল ফোর্স। অথচ তার কোনো গাড়ি নাই। তাহলে সে ডিউটি কিভাবে করবে? সে কি তবে বাবার জমি বিক্রি করে ডিউটি করবে? ওকে তো দায়িত্বই দেয়া হয়েছে ডিউটি করবে। কিন্তু গাড়ি ছাড়া ডিউটি কিভাবে? একই পদমর্যাদার ও কম পদমর্যাদার অন্যরা যদি গাড়ি পায় তবে পুলিশে কেন নয়।’

আমাদের বাজেট হচ্ছে ৪ লাখ কোটি টাকা। র‌্যাব ২০০৪ সালে যে গাড়ি ব্যবহার করছে সেই গাড়ি এখনও চলছে। পুলিশরাও ২০ বছর আগের গাড়ি ব্যবহার করছে। অথচ এখন ২০২০। যতো দেবেন ততো কাজের ইফিসিয়েনসি বাড়বে। দেশের স্বার্থে যখন যা বলবেন পুলিশ তা করবে। আশা করছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এ বিষয়গুলো দেখবে।’

‘মানুষ কোর্টের বারান্দায় বারান্দায় ঘোরে, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। পুলিশের পক্ষ থেকে যথা সময়ে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হলেও মামলা ঝুলে থাকায় জনমনে অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে। যা কিনা প্রথমত: পুলিশের উপরেই এসে বর্তায়। ১৪ লাখ ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা এখন দাঁড়িয়ে ৩৫ লাখে। এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। এজন্য আইন মন্ত্রণায়ের সাথে সমন্বয় থাকা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দরকার প্রসিকিউশন ও জুডিশিয়ারি। এ দুটির কোনোটাই স্বরাষ্ট্রে নাই। তাহলে মামলা জট কমাতে রিভিউ কমিটির কাজটা কি? একজন ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিদিন ৩০০ মামলার শুনানি দেন। কিন্তু একজন জজের পক্ষে তা হচ্ছে? আর আইনজীবী তো নতুন ডেট দিলেই তো পয়সা। যতো ডেট ততো পয়সা।’

‘মামলার আলামত ও জব্দ তালিকা কোথায় রাখবো? নিম্ন আদালতে তো পিপি কিংবা কোর্ট সাব ইন্সপেক্টরের তো কোনো কার্যালয়ই নাই। তাহলে এসব কোথায় রাখবে সিডি ডকেট, জব্দ তালিকা ও আলামত। অথচ এসবের উপরে অনেকের জীবন মৃত্যু নির্ভর করে। কিছু মিসিং হলে দায় কি তবে পুলিশের? এসবের সমাধান হওয়া জরুরি।’

একেকটা মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ বছর। সেই মামলার আলামত কোথায় থাকবে? নিয়ম অনুযায়ী এসব আদালত তার মাল খানায় মজুদ রাখবে। কিন্তু কয়টা কোর্টের মালখানা আছে? এক লাখ মামলার ২টা করে পৃষ্ঠা হলে তো ২ লাখ আলামত হয়ে যায়।’

র‌্যাব ডিজি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ হচ্ছে বাংলাদেশে ন্যাশনাল শক অ্যাবজরভার। যতো দোষ পুলিশের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজটা আসলে কারা করছে? আসলে গোড়ায় হাত না দিয়ে কমিটির পর কমিটি বানিয়ে কোনো লাভ হবে না।’

ফিনানশিয়াল ক্রাইম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এক্ষেত্রে পুলিশ কোনও কাজ করার কোনো ক্ষমতা নাই। জনগণ মনে করে পুলিশ চাইলেই পারে। কিন্তু আইনের কারণে পুলিশ যে পারে না সেটা তো জনগণ বোঝে না। হয় আমাদের দেন নয়তো তাদেরই দেন তবুও এ বিষয়টা নিষ্পত্তি হোক।’

আইজিপি তার বক্তব্যে বলেন, ‘পদোন্নতির ক্ষেত্রে যতো দিন যাচ্ছে ততো পিছিয়ে যাচ্ছে, আগে ২৪ বছরে অ্যাডিশনাল আইজিপি হতে পারে কিন্তু এখন ৩০ বছরেও হতে পারে না। আমি কিন্তু ২১ বছর বয়সে অ্যাডিশনাল আইজিপি হয়েছি। আমাদের সামনে এখন কি অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে। ৬শ জন এসপি হয়ে গিয়েছে। এরমধ্যে অ্যাডিশনাল ডিআইজি হবে মাত্র ১০৭ জন। বাকিরা কেউ হতে পারবেন না। তারপরে ডিআইজি ৬৭ জন। অর্ধেকও ডিআইজি হতে পারবে না। অ্যাডিশনাল আইজি হচ্ছে ১৭ জন। তাহলে উপরে অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যদি এ থেকে উত্তরণ ঘটানো না যায়, তাহলে যে ব্যাচগুলো আসছে তারা তো এসপি’ই হতে পারবে না।’

একটা কমিটি গঠন করে সমস্যাগুলো উত্তরণের ব্যবস্থা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

র‌্যাব ডিজির বক্তব্যের জেরে আইজিপি বলেন, ‘৩৫ লাখ মামলা কেন জমে আছে? আইন মন্ত্রণালয়কে যদি দায়িত্ব দেয়া যায় তাহলে ঠিক মতো সমাধান করতে পারবেন। কিন্তু যে রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছে এসপি এবং ডিসির তো ৩৫ লাখ মামলা কমানোর তো কোনও সুযোগ নেই।’

অপারেশনাল গাড়ির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগে ৪ জন ফোর্স নয়ে অ্যাডিশনাল এসপি নিতে পারবেন। এখন যে গাড়ি দেয়া হচ্ছে তা অপারেশনাল গাড়ি নয়। এখানে একজনের বেশি বসার অবস্থা থাকে না।’

আগের মতো অপারেশনাল গাড়ি সরবরাহের অনুরোধ জানান আইজিপি।

মাদক সংক্রান্ত কমিটিতে আইজিপি নেই, বিভাগীয় পর্যায়ে ডিআইজি তিন নাম্বারে। জেলা পর্যায়েও একই অবস্থা। এ বিষয়েও সমাধান দাবি করা হয়।

সিআইডির ডিআইজি শাহ আলম ফৌজদারি মামলায় যথাযথ সমন্বয়ের জন্য পুলিশের হাতে প্রসিকিউশন ফিরিয়ে আনার দাবি জানান এবং মেট্রোপলিটন থানা সমূহে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অফিসার ইনচার্জ হিসাবে নিয়োগের অনুরোধ করেন। এন্টিটেরোরিজম ইউনিটের প্রধান আবুল কাসেম ইউনিটের জায়গার জন্য মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত প্রস্তাবটি তাড়াতাড়ি অনুমোদনের অনুরোধ করেন।

আরও দাবি উঠে, প্রত্যেকটি জেলায় মাদকসেবীদের জন্য বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের পাশাপাশি সরকারি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন, সকল স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে জঙ্গিদের ডিরেডিকালাইজেশনের জন্য একটি কারেকশন সেন্টার স্থাপনের দাবি উত্থাপন করা হয়।

পরে সিনিয়র স্বরাষ্ট্রসচিব মোস্তফা কামাল তার বক্তব্যে বলেন, ‘পুলিশের যে ভুমিকা তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নাই। পুলিশের সুবিধা বাড়ানো মানে গণতন্ত্রের সুবিধা।’

‘একজন মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে পুলিশের কাছে যায়। আমরা রাজনৈতিক সরকারের অধীনে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হিসেবে কাজ করি। সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতা সংসদে কিন্তু আমাদের জবাবদিহিতা কিন্তু সংসদে নয় জনগণের কাছে।’

তিনি বলেন, ‘মামলা নিচ্ছেন না থাকার ওসি। এজন্য এসপিসহ মামলার আসামি হয়ে ৩/৪ জন বিপদে আছেন। যদিও কোনও এসপি এমন নির্দেশনা দেন না। নির্ভয়ে পুলিশিং করতে হলে এসবের ব্যাপারে কথা বলতে হবে।’

‘বিচার বিভাগ, দুদক, তথ্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। আসলে সবাই স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে রাষ্ট্র পরাধীন হয়ে যায়। সবার স্বাধীনতা ঠিক না। সেমিনার করে এসব ব্যাপারে কথা বলতে হবে।’

‘সব দোষ কেন পুলিশের হবে। প্রত্যেকটা আইন করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত পা বেঁধে দেয়া হচ্ছে। কাস্টমস একটা আইন করেছে। সেটার বিরুদ্ধে আমি কথা বললেও সেটা বলতে পারেন অর্ধেক পাশ হয়ে গেছে। কোনও একটা অবৈধ জিনিস কারো হাতে থাকলে যেটার কাস্টমস ডিউটি দেয়া হয় নি সেটা তালাশ করতে করতে মৃত্যু ঘটাতে পারবে। এটা কোন আইনে আছে? দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একটা মানুষকে মেরে ফেলবে পারবেন? কোনো বিমানে যদি অবৈধ পণ্য থাকে তাহলে সেটা গুলি করে নামাতে পারবেন। এমন আইন। অথচ পুলিশ যখন আসামীকে ইন্টারগেট করা অবস্থায় মারা যায় তখন আবার পুলিশ দোষী হয়ে যায়। পুলিশ আসামি হয়ে যাচ্ছে তাহলে সে ভয়ঙ্কর আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। এসব আসলে দেখা দরকার।’

এসব ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘দিন শেষে সবার নজর থাকে পুলিশ কি করেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি করলো। আমরাও অনেকরকমভাবে তৈরি হচ্ছি। জবাবদিহিতার জন্য পুলিশ প্রস্তুত। বঙ্গবন্ধু পুলিশকে জনগণের পুলিশ হতে আহবান জানিয়েছিলেন। আমরা ধীরে ধীরে সেই দিকেই যাচ্ছি। সেবার মান যাতে বৃদ্ধি করতে পারি সেজন্য সব ধরণের পুলিশ গড়ে তোলা হয়েছে।’

‘আপনাদের দাবি-দাওযা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করেছি। তিনি রিভিউ কমিটি যুগোপযুগী করার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা সেমিনার করবো। মামলার জট নিয়ে কথা বলবো। এটা নিয়ে আইনমন্ত্রণালয়ের সাথে আলাপ করবো। নতুন কিছু যোগ করা যায় কিনা দেখা হবে।’

‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের যে কমিটি সেটা নিয়েও কথা বলবো। অধিদফতরকে বলবো পুলিশের আইজি, ডিআইজি এসপিসহ বর্ডার গার্ডের চিপকেও কমিটিতে নিয়ে আসা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে যদি অধিদফতর একাই কাজ করতেন তাহলে তো সুরক্ষা বিভাগের দরকার ছিল না। কাজতো পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি অধিদফতর সবাই কাজ করছে। জাতীয় পর্যায়ে এই কমিটি রিভিউ করতে বলবো।’

আর্মির মেডিকেল কোরের মতো পুলিশের জন্যও একটি মেডিকেল কোর করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেটাও হবে। আমরা ভীষণভাবে ডাক্তারের অভাবে আছি। সেজন্য হলেও এটা দরকার। গাড়ির সমস্যা নিরসণে নতুন অপারেশনাল কাজে উপযুগী ও গাড়ির মডেল রিকিউজিশন পাঠানোর জন্য পুলিশকে আহবান জানান তিনি।

সভায় ১০ এসপিসহ উর্ধ্বতন পর্যায়ের ১৯ পুলিশ কর্মকর্তা নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং সমস্যা নিরসনে কার্যকরি পদক্ষেপ দাবি করেছেন।

Loading...