নিশ্চিতই ছিলেন বিদায়,উনি শুধু সরে গেলেন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগ করেছেন। তাঁর চলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই ছিল। অপসারিত হওয়ার চেয়ে পদত্যাগ সম্মানজনক। আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগের সুযোগ নিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সব সময় ছিল। করোনা মহামারির সময় এসব অভিযোগ আরও বড় আকারে দেখা দেয়। স্পষ্ট হয়ে ওঠে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অদক্ষ, ব্যর্থতা। জেকেজি ও রিজেন্টের দুর্নীতিতে মানুষ হতবাক হয়। কিছু মানুষ মনে করে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জড়িত না থাকলে এই মাত্রার দুর্নীতি করা সম্ভব না। কিছু মানুষ মনে করে, দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকলেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না।

মহামারি মোকাবিলার জন্য যে ধরনের নেতৃত্ব দরকার, তা দিতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন—সব ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার ছাপ স্পষ্ট। নন–কোভিড রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন না, অথচ কোভিড হাসপাতালে ৭২ শতাংশ শয্যা খালি। এসব ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। গতকাল মঙ্গলবার একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

করোনা মহামারির শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে বদলি করা হয়। তারপর একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খানকেও বদলি করা হয়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) ইকবাল কবিরকে ওএসডি করা হয়। অনেকের ধারণা ছিল, এই জরুরি সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদে পরিবর্তন এলে মাঠপর্যায়ের কাজে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। আবার একটি পক্ষের বক্তব্য ছিল, মহাপরিচালক ও তাঁর সঙ্গীরা স্বাস্থ্যের খারাপ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, করোনা মোকাবিলা কার্যক্রম জোরদার করতে হলে মহাপরিচালকের অপসারণসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তার বদলি দরকার।

আবুল কালাম আজাদের ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ভগ্ন স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। তাঁর চলে যাওয়ার কথা, নতুন মহাপরিচালক খোঁজার কথা শোনা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। গত শনিবার নিজ কার্যালয়ে তিনি একেটিভিকে বলেছিলেন, সরিয়ে দেওয়ার কথা তিনি শোনেননি।

২০১৯ সালের এপ্রিলে আবুল কালাম আজাদের মহাপরিচালক পদের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর তিনি দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। আগামী বছর এপ্রিলে বাড়তি মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। মহাপরিচালক হওয়ার আগে বেশ কয়েক বছর তিনি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ছিলেন।

রাজধানীর মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চত্বরে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান। কোথায় অনিয়ম, দুর্নীতি হয়, কীভাবে হয় তা তাঁর জানা থাকার কথা। তবে মহাপরিচালক হয়েও তিনি তা বন্ধ করতে পারেননি। গত কয়েক মাসে তিনি এই প্রতিবেদককে একাধিকবার বলেছেন, কোনো আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। কেউ তা প্রমাণ করতে পারবে না।

স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক হিসেবে আবুল কালাম আজাদ সব সময় সরকারের ভালো দিকগুলো সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি জরিপ প্রতিবেদন সময়মতো আলোর মুখ দেখেনি। কারণ, এসব প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছিল। অভিযোগ আছে, এসব প্রতিবেদন ঠিক সময় বের না হওয়ার পেছনে তাঁর একক ভূমিকা বেশি ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এই মহামারির সময় তথ্য চেপে রাখা, খণ্ডিত তথ্য দেওয়া বা ভুল তথ্য দেওয়া অব্যাহত আছে। এই মহামারির কথা মানুষ ভুলবে না। মহামারির সঙ্গে কিছু মানুষ আবুল কালাম আজাদকেও মনে রাখবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভালো নেতৃত্ব ও শক্ত জনস্বাস্থ্য পদ্ধতির মিশ্রণ দরকার। কিন্তু স্বাস্থ্যখাতে নেতৃত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পর্যন্ত সকলের মধ্যে অনাস্থা ও অনৈক্য প্রকট হয়ে উঠেছে। শৃঙ্খলার ঘাটতি দেখা যায় সবখানে।

রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে ১১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল বিভাগ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়।’ ওই দিনই অধিদপ্তরের বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে অধিদপ্তরকে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করার আগে হাসপাতাল পরিদর্শন, হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি, পরীক্ষা–নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জলবল আছে কি না, তা সরেজমিন দেখার প্রয়োজন আছে। চুক্তির পর ওইসব শর্ত পালন করেছিল কি না এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা তিন কার্য দিবসের মধ্যে ব্যাখ্যাসহ জানাতে বলা হয়। নির্দিষ্ট দিনে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা দেন আবুল কালাম আজাদ। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে দেশবাসীর সামনে।

Loading...