Ultimate magazine theme for WordPress.

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে এসএসসি পরীক্ষার সময় কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। সেই নির্দেশনা অমান্য করে প্রশাসনের নাকের ডগায় খুলনা শহরে চলছে কোচিং বাণিজ্য। খুলনা শহরে অবৈধভাবে কোচিং ব্যবসা চালাচ্ছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু শিক্ষক। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি নামে-বেনামে কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন তারা। নানা প্রলোভন এবং পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় সকল কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে’ শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির এমন ঘোষণায় তারা তোয়াক্কা না করে সদর্পে চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম।

এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ও কোচিং সেন্টারগুলোর বাণিজ্য বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রণীত নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিটও করা হয়েছে। দুদকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে গত বছর কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়। সেই নোটিশ পেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকরা জবাব দেয়ার পরিবর্তে কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা-২০১২-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এতে আদালত সেই কারণ দর্শানোর নোটিশের কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিত করার পাশাপাশি রুল জারি করেন।

হাইকোর্টে দায়ের করা রিটের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২০ জুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা ২০১২ প্রণয়ন করা হয়। তবে নীতিমালায় শাস্তির কোনো বিধান না থাকায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে ২০১৬ সালে শিক্ষা আইন প্রণয়নের পরিকল্পনায় তৈরি করা হয় আইনের খসড়া। তাতে ‘সহায়ক বই’ বা ‘অনুশীলন বই’ প্রকাশের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির সুযোগ চালু রাখার প্রস্তাব করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় খসড়ায় কোচিং সেন্টারগুলোকে ‘ছায়া শিক্ষা’ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়। এসব নিয়ে নানা আলোচনা-বিতর্ক দেখা দিলে পরে সর্বস্তরের মতামত নেয়ার জন্য খসড়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হয়। সেই ঘটনার পর তিন বছর কেটে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি শিক্ষা আইন।

অন্যদিকে, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালায় সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে নিষেধ করা হলেও অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিজ বাসায় পড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো বাধা রাখা হয়নি। এসব কারণে কোচিং বাণিজ্য জড়িতদের শাস্তির আওয়াত আনা নিয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, খুলনা বিভাগে অলিতেগলিতে গড়ে উঠেছে শতাধিক কোচিং সেন্টার যারমধ্যে মানহীন কোচিং সেন্টারের সংখ্যা অনেক বেশি। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পেছনে কোচিং সেন্টারগুলোকে দায়ী করা হয়ে থাকে। অথচ খুলনার অধিকাংশ কোচিং সেন্টার প্রকাশ্যে চালাচ্ছে তাদের কোচিং বাণিজ্য নামক কাযর্ক্রম। এমন অভিযোগ অনেক পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোচিং বাণিজ্য নামের এই ‘ঘাতক ব্যাধি’ আজ মহামারী রূপ পেয়েছে। এটা মাদকের মতো। কোচিং বন্ধের নীতিমালা বাস্তবায়নে সারা দেশে সরকারকে মনিটরিং টিম গঠন করার আহবান জানিয়েছে শিক্ষাবিদরা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা জিলা স্কুলের একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী জানান, ‘আজকাল নতুন একটি প্রবণতা শুরু হয়েছে, শিক্ষকরা ১০ জনের একটি করে ব্যাচ একজন নির্ধারিত শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে পড়িয়ে থাকেন। ব্যবহারিক পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বার পাওয়ার জন্য অভিভাবকেরা যে স্কুলে এসএসসি অথবা সমমান পরীক্ষার আসন বিন্যাস হয় সেই স্কুল কিংবা কলেজের সেই বিষয়ের শিক্ষকদের নিকট কোচিং করিয়ে থাকেন।’

সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা কলেজের এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক জানান,‘কলেজের শিক্ষকদের কাছে পরীক্ষায় ভালো নম্বার পাওয়ার জন্য পড়ালেও, বেসিক ঠিক রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে দিয়েও পড়াতে হয়। যাদের অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে তারা মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে অনেকেই পিছিয়ে থাকে।’

খুলনা সিটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ জিয়াউর রহমান জানান,‘সরকার পাঠপরিকল্পনা বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করলেও আশানুরূপ কোনও উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। স্কুল শিক্ষকদের ক্লাসের মান এবং তাদের নিজস্ব কোচিং এর পড়ানোর মান সম্পূর্ন ভিন্ন বলে জানান তিনি।’

শিক্ষাবিদ গাজি আব্দুল্লাহেল বাকি জানান, ‘আজকাল অভিভাবকদের কোচিংয়ে নিজেদের সন্তানকে দেওয়া অনেকটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন অভিভাবককে দেখে অন্যজন আগ্রহী হচ্ছে। বিদ্যালয় অথবা কলেজের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রমের গুনগত মানের নিম্নগামী, স্বল্প সময়ে শিক্ষার্থীকে পাঠদান, আলোচনা-মূল্যায়নের জন্যে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া ও পাঠদানে দুর্বলতা রয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়।’

ইন্টারএইড নামের খুলনা শাখার কোচিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ড. জামান জানান, একজন শিক্ষক তার ক্লাসে নিজস্ব কোচিং সেন্টারে ছাত্রছাত্রী বৃদ্ধির কথা না ভেবে যদি পরিপূর্ণ শিক্ষাদান করেন তবেই ছাত্রছাত্রীদের আর কোচিং ক্লাস করার প্রয়োজন হয় না। শিক্ষক যখন বাইরে কোচিং করান তখন তিনি নিজেই শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ উপায়ে তার কোচিংয়ে আসার জন্য। যদি শিক্ষার্থীরা না আসে কখনও কখনও তাদেরকে ক্লাসে নাম্বার কম দেওয়া হয় কিংবা ফেইল করানো হয়। এজন্যই সর্বাধিক সময়ে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কাছে নিরুপায় হয়ে কোচিং এ ভর্তি করাতে বাধ্য হয়।

তিনি আরও জানান, আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কোর্স শেষ করেন এবং কোনও অসদুপায় অবলম্বন না করেও এখনো তারা এগিয়ে আছেন পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিযোগিতায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.