Ultimate magazine theme for WordPress.

রোহিঙ্গাদের ‘দাপটে’ স্থানীয়দের হাড়ে-ভাতে অবস্থা

কক্সবাজার থেকে ২৯ কিলোমিটার দূরে উখিয়া উপজেলা। ২৬১.৮০ বর্গকিলোমিটারের এই এলাকার ২০৭৩৭৯ জন মানুষের ঘুম এখন আগের মত পাখির ডাকে ভাঙেনা। সবকিছু যেন বদলে গেছে নিষ্টুর এক ইতিহাসে! কক্সবাজারের অন্তর্গত এই উপজেলার ৩৭৯৪০টি পরিবার এখন অদৃশ্য এক ভবিষ্যতের স্বাক্ষী হতে ক্ষণ গুনছে প্রতিনিয়ত।

ঘটনা শুরু ২৫ আগস্ট ২০১৭। ভৌগলিকভাবে এই উপজেলার পূর্বে অবস্থিত মিয়ানমারের সৃষ্ট রাখাইন মুসলিমদের ওপর নির্মমতা তাদেরকে একপ্রকার দেশ ত্যাগে বাধ্য করে। ফলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা আশ্রয় নেয় উখিয়া উপজেলার বিক্ষিপ্তভাবে। বিগত সময়ে এইরকম রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হলেও উখিয়াবাসীর জন্য এত বেশি সংখ্যা এই প্রথম। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও তা মোটেও উখিয়াবাসীর জন্য সুখকর হয়ে ওঠেনি।

৫৪ গ্রামের এই উপজেলার ৮০ শতাংশ মানুষ যেখানে কৃষি এবং মৎসজীবি সেখানে তাদের বর্তমানের দুই পেশাই কার্যত বন্ধ বলা চলে। ১২৮১১ হেক্টর আবাদি জমির চাষে যে উপজেলা একসময় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল সেখানে বর্তমানে প্রায় তিনভাগের দুইভাগ আবাদি জমিতে চাষ নেই বললেই চলে। অধিকাংশ জমি আবার চলে গেছে রোহিঙ্গাদের পেটে। এছাড়া বিভিন্ন প্রভাবশালী দালালদের দৌরত্নে অনেক সরকারি খাস জমিও বিক্রি হয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের কাছে টাকার বিনিময়ে।

অন্যদিকে মৎসজীবী পরিবারগুলো বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেননা সীমান্তে সৃষ্ট উত্তেজনায় নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। ফলে জেলে পরিবারগুলোতে চলছে হাড়ে-ভাতে অবস্থা। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে স্থানীয় জেলে পরিবারগুলো জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন অসদুপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।

স্থানীয় এক মৎসজীবীর বলেন, ‘নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ! এ অবস্থা পরিবার নিয়ে খাব কি? চুরি ডাকাতি করা ছাড়া তো আর উপায় নাই। চুরি কোথায় করব, সবার তো আমার মত অবস্থা।’

এরইমধ্যে অনেকবার সরকার ক্ষতি পূরণের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের এতো সমস্যার কোন সমাধান নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।

স্থানীয় এক কলেজ ছাত্র বলেন, তিন লাখ স্থানীয় মানুষের বিপরীতে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের ওপরে। মনের মধ্যে প্রায়ই প্রশ্ন আসে কারা আসলে সংখ্যালঘু? আমরা নাকি তারা?

বলতে গেলে সব মিলিয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা উখিয়াবাসীর। অন্যদিকে উখিয়ায় রোহিঙ্গারা অবাধে ঘোরাফেরা করলেও নিরাপত্তার কারণে স্থানীয়দের এখন নিজের পরিচয়পত্র নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে উখিয়ার বিভিন্ন রকম স্থানীয় কাজে প্রায় এক তরফা জড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা। স্থানীয়দের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে কাজ করে বলে স্থানীয় মানুষদের দর্শকের আসনে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরনের টং দোকান থেকে শুরু করে প্রায় এক তরফা ব্যবসায় নেমে পড়েছেন তারা। এছাড়া অতিরিক্ত পরিমাণ প্রাপ্ত ত্রাণ সামগ্রীও অনায়াসে বিক্রি করছে তারা প্রতিদিনই। বাইরের অনেক সিন্ডিকেট তাদের ফুসলিয়ে ত্রাণ সামগ্রী পাচার করছে উপজেলার বাইরে। ফলে স্থানীয় মানুষেরা লাগাম পাচ্ছেনা সুযোগ নামক কোন সোনার হরিণের।

অন্যদিকে বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের কাজ দিতে অনীহা প্রকাশ করায় তারা একতরফা বেকার দিনযাপন করছে। এ নিয়ে অনেকবার মানব বন্ধন হলেও অদৃশ্য কারণে এর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার উখিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছেনুয়ারা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেকে কাজ পাচ্ছে না, রোহিঙ্গাদের দিয়ে কাজ করানোর ফলে। সব মিলিয়ে বলতে গেলে বনও সব উজাড় হয়ে গেছে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসাইন বলেন, ‘যে যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা দেশের এখন জাতীয় এবং প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের জীবন ব্যবস্থাকে চ্যালেজ্ঞের মুখে ফেলা এই সমস্যা যত দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে দেশের জন্য ততই মঙ্গল হবে।’

শুধু উখিয়া নয় রোহিঙ্গা সমস্যার প্রভাব পড়েছে পুরো কক্সবাজার জেলায়। বর্তমানে এ সমস্যার কারণে কক্সবাজার পর্যটন শিল্প একপ্রকার হুমকির মুখে পড়েছে। বিগত বছরগুলোতে কক্সবাজারের চেহারার সাথে বর্তমান অবস্থা একেবারেই বিপরীত। এভাবে চলতে থাকলে জেলার প্রতিটি ক্ষেত্রে একপ্রকার অচল অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। সবার মনে একটাই প্রশ্ন এখন, এর সমাধান কি?

Leave A Reply

Your email address will not be published.