Ultimate magazine theme for WordPress.

বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ

চলমান মহামারী পরিস্থিতিতে বহির্বিশ্ব থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। একের পর এক দেশের প্রবেশ দুয়ার বন্ধ হয়ে পড়ছে বাংলাদেশীদের জন্য। বিশ্বব্যাপী মহামারীর নতুন প্রবাহ দেখা দেয়ায় গত ১৪ এপ্রিল আন্তর্জাতিক সব রুটের বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। পরে গত ৩০ এপ্রিল কর্তৃপক্ষ সীমিত আকারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের অনুমতি দিয়ে সার্কুলার জারি করে। বেবিচকের ওই সার্কুলারেই করোনার উচ্চঝুঁকিযুক্ত ১২ দেশ থেকে বাংলাদেশে যাত্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়। তবে শেষরক্ষা হয়নি। উল্টো করোনার ভারতীয় ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ এবার নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করছে বাংলাদেশকেই।

দেশগুলো বলছে, করোনার ভারতীয় ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে আগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল আগেই। সর্বশেষ গত বুধবার এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে কুয়েতও।

অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে কুয়েতের স্থানীয় বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ডিজিসিএ)। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা থেকে আগতদেরও প্রবেশ বন্ধ করে দেয়ার কথা বলা হয়। অনির্দিষ্টকালের এ নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির সঙ্গে যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে পড়লেও কার্গো উড়োজাহাজ চলাচলে কোনো বাধা থাকছে না।

ডিজিসিএর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নিষিদ্ধের তালিকায় থাকা এ চার দেশের নাগরিকদের কুয়েতে প্রবেশ করতে হলে এর আগে অন্য কোনো দেশে অন্তত ১৪ দিন অবস্থান করে ‘কোভিড নেগেটিভ’ হতে হবে।

এর আগে গত সোমবার করোনার ভারতীয় ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে আগতদের প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে থাইল্যান্ড। যদিও পাকিস্তানে নিযুক্ত থাই দূতাবাসের ভাষ্যমতে, এ তিন দেশের যাত্রীরা ট্যুরিস্ট বাদে অন্য ক্যাটাগরির ভিসা নিয়ে ১৫ মে পর্যন্ত থাইল্যান্ড ভ্রমণ করতে পারবেন। এছাড়া দেশটিতে আগে থেকেই ভারত থেকে যাওয়া যাত্রীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল।

তবে থাইল্যান্ডের নাগরিক ও কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের ক্ষেত্রে এ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার।

গত ২৪ এপ্রিল পাকিস্তান থেকে থাইল্যান্ডে যাওয়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর দেহে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়। ৪২ বছর বয়স্কা এ থাই নারীই দেশটিতে শনাক্তকৃত ভারতীয় ধরনের প্রথম বাহক।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও (ইউএই) সোমবারেই বাংলাদেশসহ চারটি দেশ থেকে যাত্রী ও ফ্লাইট প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিষেধাজ্ঞার অধীন অন্য তিন দেশ হলো নেপাল, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান। ইউএইর ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (এনসিইএমএ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৩ মে থেকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকার কোনো যাত্রী ও উড়োজাহাজ আমিরাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি এ চার দেশে ট্রানজিট নেয়া যাত্রীদের জন্যও আমিরাতের দুয়ার বন্ধ থাকবে। তবে দেশ চারটিতে ট্রানজিট নেয়া ফ্লাইট ইউএইতে প্রবেশ করতে পারবে। এ নিষেধাজ্ঞা কতদিন বহাল থাকবে, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি এনসিইএমএ।

এর আগে ৮ মে দেশে প্রথম করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। একই দিনে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মালয়েশিয়া। দেশটি বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের প্রবেশে এ নিষেধাজ্ঞা দেয়। যদিও এর আগে টানা দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ৪ মে থেকে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছিল।

ইউরোপের দেশ ইতালি বাংলাদেশীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে গত মাসেই। করোনার নতুন ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর একযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ভূমধ্যসাগরীয় দেশটি। গত ২৯ এপ্রিল জারি করা এ-সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়, ওইদিনের ঠিক ১৪ দিন আগে থেকে (১৫ এপ্রিল) যারা বাংলাদেশ ও ভারতে অবস্থান করেছে, তাদের কেউই ইতালিতে ঢুকতে পারবে না। তবে দেশটির নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই, তৃতীয় এমন কোনো দেশে ১৪ দিন অবস্থানের পর ইতালিতে প্রবেশ করা যাবে।

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিকে কারণ দেখিয়ে গত ১ মে রাত ১২টা থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশ থেকে যাত্রী ঢোকা নিষিদ্ধ করে সিঙ্গাপুর। অন্য দেশগুলো হলো নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা। এর আগে ২০ এপ্রিল ভারত থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল দেশটি। এছাড়া অন্য দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রানজিট সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে সিঙ্গাপুর। তবে কত দিনের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।

ওমানও বাংলাদেশীদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২৪ এপ্রিল থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। দেশটির নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ভারত-পাকিস্তানও রয়েছে। এর আগে প্রবাসী কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরাতে ওমানে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাস্কাটগামী বিশেষ ফ্লাইটগুলো শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।

নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর প্রায় সবই দেশের বড় শ্রমবাজার। এ কারণে দেশের জনশক্তি রফতানি খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও বলছে, হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় নতুন কর্মীরা যেমন শঙ্কায় পড়ছেন, তেমনি বিপদে পড়ছেন ছুটিতে আসা কর্মীরাও। কারণ যারা ছুটিতে এসেছিলেন তাদের ভিসা, আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। ঠিক সময়ে ফিরতে না পারলে আকামার মেয়াদ নবায়ন করা নিয়েও সমস্যায় পড়বেন তারা।

বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সউদী আরবের সঙ্গে এখনো ফ্লাইট চালু রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে করোনার টিকা না নেয়া যাত্রীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর খরচও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। ২০ মে থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে সউদী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আপাতত প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের ন্যূনতম সময়সীমা রাখা হয়েছে সাতদিন।

ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সউদীগামী প্রবাসী যাত্রীদের ভ্রমণ ব্যয় অনেকখানিই বেড়েছে। সউদী সিভিল এভিয়েশন অথরিটি জানিয়েছে, এরই মধ্যে এ নির্দেশনা সব এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সউদী পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ও নির্ধারিত হোটেলগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এজন্য এয়ারলাইনসগুলোকে টিকিটের মূল্যের সঙ্গে হোটেলে অবস্থানের চার্জও নিয়ে নিতে হবে।

স¤প্রতি যুক্তরাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের উদ্দেশে ১১৬টি দেশে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার সুপারিশ করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এ তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। তালিকায় যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, ইসরায়েল, মেক্সিকো, জার্মানিসহ আরো কিছু রাষ্ট্রকে কোভিড-১৯-এর অতি উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকিযুক্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ তালিকায় ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান, ফিনল্যান্ড, মিসর, বেলজিয়াম, তুরস্ক, ইতালি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও স্পেনও রয়েছে। এছাড়া নেপাল, চীন ও জাপানের মতো কয়েকটি দেশে ভ্রমণের বিষয়টি ‘পুনর্বিবেচনা করার’ সুপারিশ করা হয়েছে। শ্রীলংকা ও ভুটানকে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও প্রথম পর্যায়ের ভ্রমণ সতর্কতার তালিকায় রাখা হয়েছে।
এদিকে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নেপালকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বেবিচক। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার থেকে দেশটির সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গত রোববার এক সার্কুলারে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে বলে জানিয়েছে বেবিচক।

বেবিচক পরিচালক (ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) গ্রুপ ক্যাপ্টেন ইমরানুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে করোনার সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকায় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নেপালের সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে। নেপাল ছাড়াও অন্য ১২টি দেশের ওপরও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, সাইপ্রাস, জর্জিয়া, ভারত, ইরান, মঙ্গোলিয়া, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও তিউনিসিয়া।

তবে এসব দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ অনুমতি নিয়ে দেশে আসতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তাদের দেশে পা রাখার আগেই ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য নিজ খরচে সরকার নির্ধারিত হোটেল বুকিং করতে হবে।

এর আগে ৩০ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে সীমিত আকারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের অনুমতি দিয়ে সার্কুলার দেয় বেবিচক। এতে বলা হয়, ১ মে থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বিশেষ শর্তসাপেক্ষে ৩৮টি দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফ্লাইট চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলজিয়াম, চিলি, ক্রোয়েশিয়া, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, ইরাক, কুয়েত, ইতালি, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, নেদারল্যান্ডস, প্যারাগুয়ে, পেরু, কাতার, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক ও উরুগুয়ে।

সার্কুলারে আরো জানানো হয়, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের প্রবাসীদের দেশে ফেরার পর তিনদিনের বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এরপর তাদের করোনা পরীক্ষা করানো হবে। রিপোর্ট নেগেটিভ এলে তাদের ১১ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.