করোনা নিয়ন্ত্রণ বহুদূর !

 করোনা শনাক্তের ৪৭৭তম দিনে এসে মহামারিকালে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখলো বাংলাদেশ।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ থেকে বাংলাদেশ এখনও বহুদূরে। চলমান লকডাউনে সংক্রমণের গতি নিম্নমুখী হতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। এদিকে, লকডাউনের খবরে আবারও ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার হিড়িক লেগেছে। কাঁচাবাজারে বেড়েছে ভিড়। এমনকি কোরবানির ঈদের অগ্রিম কেনাকাটা করতেও শপিংমলগুলোতে ভিড় দেখা গেছে। এতে শনাক্ত ও মৃত্যু আরও বাড়বে বলে জানান তারা।

সরকার ২৮ জুন ভোর থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত সীমিত পরিসরে লকডাউনের ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে- পণ্যবাহী যানবাহন ও রিকশা ছাড়া সকল গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে সকল শপিং মল, মার্কেট, পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র।

দেশে করোনাতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসেবে মোট মারা গেলেন ১৪ হাজার ১৭২ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরে তথ্যানুযায়ী, মৃত্যুসংখ্যা ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজারে আসতে অর্থাৎ শেষের এক হাজার মানুষ মারা গেছেন মাত্র ১৫ দিনে। আন্তর্জাতিক জরিপ প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডোমিটারস জানায়, করোনায় মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৮তম।

মৃত্যুর পাশাপাশি গত তিন সপ্তাহ ধরে শনাক্তর সংখ্যাও ঊর্ধ্বগামী। পরিস্থিতি কতোটা ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে সেটা বোঝা যায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সপ্তাহভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকেই।

অধিদফতর শনিবার (২৬ জুন) জানায়, ২০-২৬ জুন পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ১১১ জন। তার আগের সপ্তাহে ২৩ হাজার ৫৪১ জন। এই এক সপ্তাহে শনাক্তের হার বেড়েছে ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ।

একইভাবে, গত সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৫৮৭ জন। তার আগের সপ্তাহে মারা যান ৩৯৫ জন। মৃত্যুহারও বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গত ২৪ জুন সারাদেশে প্রথমবারের মতো ১৪ দিনের সম্পূর্ণ শাটডাউনের সুপারিশ করে। সারাদেশে উচ্চ সংক্রমণ এবং ৫০টিরও বেশি জেলায় অতি উচ্চ সংক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে কমিটি জানায়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য খণ্ড খণ্ডভাবে নেওয়া কর্মসূচির উপযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টানা তিন সপ্তাহ রোগী শনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে বলা যাবে, দেশটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে।

অথচ দেশে ২৭ জুন শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ২৬ জুন ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ, ২৫ জুন ২১ দশমিক ২২ শতাংশ, ২৪ জুন ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ২৩ জুন ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ, ২২ জুন ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ, ২১ জুন ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ ও ২০ জুন শনাক্তের হার ছিল ১৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের ৬৪টির মধ্যে ৪০টি জেলাই ‘অতি উচ্চ’ ঝুঁকিতে আছে। ১৫টি জেলা রয়েছে উচ্চঝুঁকিতে, আটটি জেলা আছে মধ্যম ঝুঁকিতে। বান্দরবান জেলায় নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম হওয়ায় এই জেলাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার সবকটিই উচ্চঝুঁকিতে।

রোগী ম্যানেজমেন্টও জরুরি

পুরো দেশজুড়ে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ ও লকডাউনে সংক্রমণে গতি কমবে জানিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শনাক্তের হারে আমরা কখনও শূন্যে নামতে পারিনি।

লকডাউন যথেষ্ট নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংক্রমণের উৎস কমাতে হবে। রোগী ম্যানেজমেন্টও জরুরি। রোগীদের শনাক্ত করে তাদের আইসোলেশন, ও সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিনে নেওয়া খুব দরকার। টিকা আসলে টিকা নিতেই হবে সবাইকে। এরপরও মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। টিকায় মৃত্যু কমলেও সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায়।’

জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় দাস বলেন, সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কমতে আরও সময় লাগবে। ঈদের সময়ও বাড়ি যাবে মানুষ। আবার লকডাউনের সংবাদে বিভিন্ন স্থানে যেভাবে ভিড় দেখা গেছে তাতে আগামী কয়েকদিন সংক্রমণ আরও বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি দ্রুত মোকাবিলা করাটা বেশ কঠিন হবে। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বড় উপায়। তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রোগী ও তার সংস্পর্শে এসেছে যারা তাদের ট্রেসিং করে কোয়ারেন্টিন করা।

Loading...