উত্তর কোরিয়ার উদ্ভট ও অদ্ভুত যত আইন!

আব্বাস উদ্দিন, ডেস্ক রিপোর্ট:

বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি উত্তর কোরিয়ায় অনেকগুলো আইনকানুন ও শাসন চালু রয়েছে যার অধিকাংশই খুবই ভয়ঙ্কর। কিছু আবার ভয়ঙ্কর না হলেও হয়ত সেখানকার অধিবাসীদের অনিচ্ছায় বা জোর করে করানো হয়। এই যেমন, সেখানকার অধিবাসীরা চাইলেই ইচ্ছেমতো চুলের স্টাইল করতে পারে না। মন চাইলে ভিনদেশি কোনো গান শুনতে পারে না, পারে না আন্তর্জাতিক কল করতে। এভাবেই উত্তর কোরিয়ার সরকার সর্বগ্রাসী শাসন ব্যবস্থা চালু করেছে।

২০১৭ সালের মার্চের দিকে ইয়াওমি পার্ক নামের একজন উত্তর কোরিয়ান মেয়ে সরকার কিম জং উনের সর্বগ্রাসী শাসনের খাঁচা থেকে পালিয়ে এসে উত্তর কোরিয়ার বেশকিছু অদ্ভুত শাসনের কথা মিডিয়ার কাছে তুলে ধরেন। তখন থেকেই সারাবিশ্বে উত্তর কোরিয়ার শাসনের প্রতি গণমানুষের নজর চলে যায়। আজকের লেখায় জানাবো উত্তর কোরিয়ার বেশকিছু কঠিন ও অদ্ভুত আইনকানুন সম্পর্কে :

ভিডিওতে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি দেখুন…

সরকার নির্ধারিত টেলিভিশন চ্যানেল :
আমাদের দেশে বর্তমানে সরকারি চ্যানেল ছাড়াও অনুমোদিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে ৪৪টি। এছাড়াও চাইলেই ইন্টারনেটের ও ডিস অ্যান্টেনার মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তের চ্যানেল দেখতে পারি। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার অধিবাসীরা চাইলেই তা পারেন না। তাদের ওখানে মাত্র চারটি টেলিভিশন চ্যানেল দেখার অনুমতি রয়েছে। আবার সেই চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানগুলো সরকারিভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

তিন প্রজন্মকে শাস্তি :
উত্তর কোরিয়া যদি কেউ অপরাধ করে তবে, সেই অপরাধের জন্য তিন প্রজন্মকে শাস্তি দেওয়া হয়। দাদা-দাদী, বাবা-মা ও সন্তানকে সেই অপরাধের শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয়। এমন অদ্ভুত শাস্তির দ্বারা অপরাধী যাতে শাস্তি থেকে রক্ষা না পায় তা নিশ্চিত করে! কেউ উত্তর কোরিয়ান কঠিন আইনকানুন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইলে ভোগ করতে পারেন কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি। পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে তাদের কঠিন সব কাজে পাঠানো হয়। গুরুতর শাস্তি দেওয়া হয়। এছাড়াও দেওয়া হতে পারে মৃত্যুদণ্ড।

চুলের স্টাইল হয় সরকার নির্ধারিত :
২০১৩ সাল থেকে চুলের স্টাইলও নির্ধারণ করে দিয়েছে উত্তর কোরিয়ার সরকার। সেখানে ২৮ ধরনের চুলের স্টাইল করার অনুমতি রয়েছে। এর মধ্যে মেয়েদের জন্য ১৮ প্রকার ও ছেলেদের জন্য ১০ প্রকার চুলের স্টাইল করার অনুমতি রয়েছে। সরকার প্রবর্তিত স্টাইলের বাইরে কেউ চুল কাটালে তা সরকার বিদ্রোহী হিসেবে গণ্য হয়।
সাধারণত ছেলেদের চুল লম্বায় ২ ইঞ্চির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। তবে বয়স্ক পুরুষ ৩ ইঞ্চির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হন। অপরদিকে, বিবাহিত মেয়েদের চুল ছোট রাখতে বলা হয়। আবার অবিবাহিত মেয়েরা কিছুটা দীর্ঘ চুল রাখতে পারেন।
অন্য সবার চুলের স্টাইলে নিয়মনীতি করে দিলেও নেতা কিম জং উন কিন্তু কোনো নিয়মের আওতায় চুলের স্টাইল করেননি। নেতা হিসেবে তার সেই চুলের স্টাইল উত্তর কোরিয়ায় একক ও অদ্বিতীয় রাখা হয়েছে। সত্যিই বিস্ময়কর শাসন!

রাজধানীতে বাসা তৈরিতে লাগবে অনুমোদন :
টাকা পয়সা থাকলেই আমাদের দেশে রাজধানী শহরে বাসা-বাড়ি করা যায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে কেউ চাইলেই বাসা-বাড়ি করে বসবাস করতে পারবেন না। নেতা কিম জং উন চান তিনিই রাজধানীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে বাস করবেন। তাই ভিন্ন কেউ বেশি বড় হতে চাইলে অনুমতি নাও মিলতে পারে।

আন্তর্জাতিক ফোন কল :
কেউ চাইলেই আন্তর্জাতিক ফোন কল করতে পারবেন না। এই শ্বাসরোধকারি আইনের দ্বারা উত্তর কোরিয়ার সরকার তার দেশের তথ্য বাইরের দেশে পাচার হওয়া রোধ করেন।

অ্যাপল, সনি ও মাইক্রোসফটের পণ্য নিষিদ্ধ :
উত্তর কোরিয়ায় আইফোন, সনি কোম্পানির টেলিভিশন, ল্যাপটপ ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। তবে এসব ক্ষেত্রে নিজস্ব তৈরি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন।

ইন্টারনেট :
উত্তর কোরিয়ায় ইন্টারনেট সরবরাহ কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। তবে সেখানে নির্দিষ্ট কিছু পেশার জন্য কিছু ওয়েবসাইটে সরকারি তত্বাবধানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।

নিষিদ্ধ বিকিনি :
উত্তর কোরিয়ার বড় শহরগুলোতে মেয়েরা প্যান্ট পরতে পারেন না ও সাইকেল চালানোর অনুমতি পান না। স্কার্ট পরে হাঁটু ঢেকে রাখতে হয়। নাভি বের করে চলার অনুমতি না থাকায় তাদের জন্য বিকিনি পরা নিষিদ্ধ।

বাস্কেটবল খেলায় নিজস্ব নিয়ম :
বাস্কেটবল খেলায় উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব নিয়ম চালু রয়েছে। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভাল না থাকায় এরা এই খেলায় নিজস্ব নিয়ম প্রয়োগ করেন। কারণ বাস্কেটবল খেলা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবিত।

ভ্রমণ :
উত্তর কোরিয়া থেকে বাইরের দেশে খুব সহজে ভ্রমণের অনুমতি মেলে না। সরকার অনুমতি না দিলে বাইরের দেশে ছুটি কাটানো এমন কী পার্শ্ববর্তী দেশ দক্ষিণ কোরিয়াতে স্বল্প সময়ের জন্যও ভ্রমণ করতে যাওয়া যাবে না।

আবার বিভিন্ন ধরনের অদ্ভুত শাসন ব্যবস্থা থাকলেও আপনার উত্তর কোরিয়া ভ্রমণের অনুমতি মিলতে পারে। তবে সেখানে কখনোই একা একা ঘুরতে পারবেন না। সেখানে কিছু গাইড থাকবে যারা সার্বক্ষণিক আপনাকে পর্যবেক্ষণে রাখবেন। এছাড়াও ভ্রমণকারী যারা সেখানে যাবেন বা সেখান থেকে বাইরের দেশে যাবেন সকলেরই ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার চেক করা হবে।

উপরিউক্ত আইনকানুন ছাড়াও আরও কিছু শাসন কোরিয়ার সরকার প্রবর্তন করে থাকেন। যেমন- সেখানে নাচের আয়োজন করা যায় না, রাষ্ট্রীয় দিনে অ্যালকোহল পান নিষিদ্ধ, কিমের দাদার মৃত্যু দিবসে উচ্চস্বরে হাসতেও মানা! মোটকথা এসব অদ্ভুত আইন সরকারের একক আধিপত্যেরই পরিচায়ক বলা যায়।

 

Loading...